হঠাৎ যেন থমকে গেল বিশ্ব। অজানা আতঙ্কে সবাই ঘরবন্দি। অনেক গবেষণার পর জানা গেল, করোনাভাইরাস নামক এক ভাইরাস জ্বরে কাঁপছে পৃথিবী। অসহায় বিশ্ববাসী তখন নিরন্তর প্রচেষ্টায় লিপ্ত, কীভাবে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। করোনাভাইরাসের টিকা আবিস্কারে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় নেতৃত্ব দিলেন এক নারী গবেষক সারাহ গিলবার্ট।

তিনি এই ভ্যাকসিন তৈরির কাজে অ্যান্ড্রু পোলার্ড, তেরেসা ল্যাম্বে, স্যান্ডি ডগলাস, ক্যাথরিন গ্রিন এবং অ্যাড্রিয়ান হিলের পাশাপাশি নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার আগের কাজগুলোর মতো কভিড-১৯ টিকা একটি অ্যাডেনোভাইরাল ভেক্টর ব্যবহার করে, যা করোনাভাইরাস স্পাইক প্রোটিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতিক্রিয়া জাগিয়ে তোলে। তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন ২৫০ গবেষক। করোনা টিকা তৈরির কাজে যখন নামেন তাঁরা, তখনও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাকে অতিমারি বলে ঘোষণা করেনি। ২০১৪ সালে যখন ইবোলা মহামারির চেহারা নেয়, তখনও সারাহ ও তাঁর গবেষকদের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দায়িত্ব দেয়।

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার কভিড টিকা উদ্ভাবনকারী বিজ্ঞানীদের অন্যতম প্রফেসর সারাহ গিলবার্ট মানুষের প্রাণ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। তাঁর মেডিসিনের দিকে ঝোঁক স্কুলজীবন থেকেই। ক্যাটারিং স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে ইউনিভার্সিটি অব অ্যাংলিয়ায় জীববিদ্যায় স্নাতক। কোনো হলিউড তারকা নন, তবু টিভির পর্দায় তাঁর জয়ের হাসিটুকু দেখার অপেক্ষায় মুখিয়ে গোটা বিশ্ব। কারণ 'বিশল্যকরণী'র খোঁজে পৃথিবী যখন তোলপাড়, তখন সর্বপ্রথম 'সুখবর' দেন এই সারাহ। দাবি করেছিলেন, সে বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে কভিড-১৯ এর প্রতিষেধক আনছেন।

তার পর ইউনিভার্সিটি অব হালে ডক্টরেট। পড়াশোনা শেষ করে লেস্টারের একটি সংস্থায় দুই বছর কাজ করেন। তারপর অন্য একটি বায়োটেক সংস্থায় ওষুধ প্রস্তুত সংক্রান্ত কাজে যোগদান। ১৯৯৪ সালে চলে আসেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০৪-এ রিডার পদে যোগ দেন। এর পর ২০১০-এ জেনার ইনস্টিটিউটে যুক্ত হন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি হওয়া 'ভ্যাকসিটেক' নামক একটি সংস্থার সহপ্রতিষ্ঠাতাও সারাহ। তবে নিজেই জানিয়েছেন, ভ্যাকসিনোলজিস্ট হওয়ার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না তাঁর। 'জেনেটিক্স নিয়ে কাজ করতে অক্সফোর্ডে এসেছিলাম। ম্যালেরিয়া হলে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে, সেসব নিয়ে গবেষণা শুরু করি। এভাবেই ধীরে ধীরে ভ্যাকসিনোলজিস্ট হয়ে ওঠা।'

তবে এমন ঝকঝকে ব্যক্তিত্ব নিয়েও পুরুষপ্রধান সমাজে কম লড়তে হয়নি সারাহকে। তিন সন্তানের মা (ট্রিপলেটস) সারাহর হাতে এক সময় সংসার খরচটুকুও থাকত না। মহিলা বিজ্ঞানী হিসেবে বেতন সামান্যই। মাসের শেষে যা হাতে পেতেন, তাতে বাচ্চাদের জন্য নার্স রাখতে পারেননি। এদিকে গবেষণার কাজ বন্ধ করলে চলবে না। শেষে চাকরি ছেড়ে শিশুসন্তানদের দেখাশোনার দায়িত্ব নেন সারাহর স্বামী। ২০১৯ সালে বিজ্ঞানীদের মধ্যে লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে একটি সমীক্ষা-রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। তাতে দেখা যায়, পুরুষ বিজ্ঞানীদের থেকে মহিলারা অন্তত ২২ শতাংশ কম পারিশ্রমিক পান। তবু একাংশের মতে, এই ব্যবধান অনেকটাই কমছে, তবে ধীরে ধীরে।