রংপুর কাউনিয়া উপজেলায় তিস্তা নদীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে তিস্তা রেল সেতু। রংপুরের সঙ্গে ওপারের লালমনিরহাটের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম এই সেতুটি। এর মেয়াদ ছিল একশ বছর। ২০০০ সালে সেতুটি শত বছর পার করেছে। মেয়াদোত্তীর্ণের পর ২২ বছর অতিবাহিত হওয়ায় সেতুটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ। এ সেতুটি ছাড়াও রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট রেলওয়ে ডিভিশনে এমন মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু রয়েছে শতাধিক। এসব সেতু দিয়েও প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলছে ট্রেন।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, লালমনিরহাট ও পাকশী দুটি রেল বিভাগ নিয়ে পশ্চিমাঞ্চলীয় রেলওয়ে। এর মধ্যে লালমনিরহাট রেল বিভাগে রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর নীলফামারী ও বগুড়া জেলার ওপর দিয়ে রেলপথ রয়েছে ৫০০ দশমিক ১ কিলোমিটার। এই রেলপথে সেতু

রয়েছে প্রায় ৪১০টি। এর অধিকাংশের অবস্থা খুব নাজুক। ২০১৭ সালে বন্যার সময় পশ্চিমাঞ্চলীয় রেলের ১২৫টির বেশি স্থানে রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, দিনাজপুর ও লালমনিরহাট জেলায়। রেললাইনের পাথর বন্যার পানির তোড়ে ভেসে যায়। সেই সময় থেকে বেশ কয়েকটি রেল সেতুও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

তিস্তা রেল সেতু দিয়ে একসময় রেলের পাশাপাশি অন্যান্য যানবাহনও চলাচল করত। তবে তিস্তায় সড়ক সেতু নির্মাণের ফলে বর্তমানে ওই সেতু দিয়ে কেবল রেল যোগাযোগ সচল আছে। এ সেতুর ওপর দিয়ে প্রতিদিন ৫টির বেশি রেল যাতায়াত করে। হাজার হাজার দর্শনার্থী প্রতিদিন তিস্তার বুকে শতবর্ষী রেল সেতু দেখতে ভিড় করেন।

জানা যায়, ১৮৯৯ থেকে ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে তিস্তা নদীর ওপর রেলওয়ে সেতুটি নির্মাণ করা হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য একটি সেতু থেকে স্প্যান, গার্ডার ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করে ১৯৭২ সালে তা মেরামত করা হয়। অনেকদিন পর্যন্ত সেতুটি কেবল রেল যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। বিকল্প সেতু তৈরির ব্যয় চিন্তা করে তৎকালীন সরকার সড়ক যোগাযোগের সম্ভাব্যতা ও উপযুক্ততা যাচাই করে ১৯৭৮ সাল থেকে এ রেল সেতুর ওপর দিয়ে রেলের পাশাপাশি অন্যান্য যানবাহনও চলাচলের ব্যবস্থা করে। এরপর তিস্তা সড়ক সেতু নির্মাণ করা হলে বর্তমানে ওই সেতুটি দিয়ে কেবল রেল চলাচল করছে। তিস্তা রেল সেতু দিয়ে বর্তমানে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস, লালমনি এক্সপ্রেস, করতোয়া এক্সপ্রেস, লালমনি কমিউটার, রমনা লোকালসহ বেশ কিছু ট্রেন চলাচল করছে। একশ বছর মেয়াদি সেতুটি ২০০০ সালে শত বছর পার করেছে।

রেলওয়ে সূত্রে আরও জানা যায়, লালমনিরহাট রেল বিভাগের সেতুগুলো ব্রিটিশ আমলে নির্মিত। তখন এগুলো চুন-সুরকি দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। এগুলোর আয়ুস্কাল ৬০ বছর এবং আরসিসি সেতুর মেয়াদ ধরা হয় একশ বছর। লালমনিরহাট রেল বিভাগের শতাধিক রেল সেতু বহু আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে।

তবে রেল বিভাগ বলছে, অধিকাংশ সেতুই মেরামত করে চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে। এদিকে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ঝুঁকিপূর্ণ তিস্তা রেল সেতুর পাশে আরেকটি সেতু নির্মাণের সমীক্ষা করেছে রেলের একটি বিশেষজ্ঞ দল।

আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেনগুলোকে ঘণ্টায় ৬৫ কিলোমিটার গতিতে চালানোর কথা। ওই গতিতে সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করলে ট্রেন ও যাত্রীদের অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি খেতে হয়। এ ছাড়া পণ্যবাহী ট্রেন সেতুর ওপর উঠলে সেতু ও ট্রেন দুটোই অত্যধিক কাঁপে। তবে পার্বতীপুর থেকে পঞ্চগড় পর্যন্ত রেল সেতুগুলো নতুন করে মেরামত করা হয়েছে দাবি রেল বিভাগের।

রেলের লালমনিরহাট বিভাগের ইঞ্জিনিয়ার আহসান হাবিব বলেন, এপ্রিলের শুরুর দিকে তিস্তা রেল সেতুর পাশে আরেকটি সেতুর সমীক্ষা করে গেছেন একটি দল। ডিভিশনে কতগুলো সেতু মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে, তা কাগজ না দেখে বলা সম্ভব নয়, তবে অধিকাংশ সেতু মেরামত করা হয়েছে।