জ্যৈষ্ঠের হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম নগর। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি জমে থাকায় ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। এ অবস্থায় বর্ষার আগমনী বার্তা দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। ফলে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি এবার আরও ভয়াবহ হবে বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা। সিটি করপোরেশনের দাবি, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় নির্মাণকাজের জন্য খালের ভেতরে দেওয়া অস্থায়ী বাঁধগুলো দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে। ২০টি খালে অন্তত ৩৬টি বাঁধ রয়েছে। এসব বাঁধ অপসারণে সিডিএকে চিঠি দিয়েছে সিটি করপোরেশন। ১০ দিনের সময়ও বেঁধে দেন সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। তবুও পুরোপুরি অপসারণ হয়নি বাঁধগুলো। এরই মধ্যে গতকাল শুক্রবার মাত্র ১৬ মিলিমিটার বৃষ্টিতে পানি জমে যায় নগরের বিভিন্ন এলাকায়।

ময়লা পানি মাড়িয়ে জুমার নামাজ আদায় করতে মসজিদে যেতে হয় মুসল্লিদের।

নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকায় চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে। তবুও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। উল্টো অবনতি হয়েছে বলে মনে করছে নগরবাসী। এর মধ্যে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) 'চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন' শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় খালগুলোতে অস্থায়ীভাবে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড।

সিটি করপোরেশনের তালিকা অনুযায়ী, নগরের একাংশের পানি নিস্কাশনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম মহেশখালে আটটি বাঁধ রয়েছে। নগরের অন্য অংশের পানি নিস্কাশনের প্রধান মাধ্যম চাক্তাই খালের বহদ্দারহাট পুলিশ বক্স, হাইজ্জ্যার পোল ও ফুলতলা এলাকায় বাঁধ রয়েছে। এ ছাড়া মির্জা খালের খতিবের হাট মসজিদ, হাদু মাঝির পাড়ার মসজিদ, চান মিয়া সওদাগর পুল ও কালারপোলে মাটির বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নগরের মোহনা ক্লাব ও রাহাত্তর পুল এলাকায় বীর্জা খালে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। শীতলঝর্ণা খাল, ডোম খাল, উত্তরা খাল, ত্রিপুরা খাল, চশমা খাল, গয়নার ছড়া খাল, সুরভী খাল, গুলজার খাল, রামপুর খাল, নাছির খাল, বারমাসিয়া খাল, টেকপাড়া খাল, ৭ নম্বর খাল, ৯ নম্বর গুপ্ত খাল, ১৫ নম্বর খাল ও ১৭ নম্বর খালে বাঁধ রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার খালগুলো পরিদর্শনে যায় সিটি করপোরেশন, সিডিএ ও জেলা প্রশাসনের একটি প্রতিনিধি দল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন পতেঙ্গা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) জিসান বিন মাজেদ। তিনি সমকালকে বলেন, বাঁধের কারণে যেসব এলাকায় পানি চলাচল বন্ধ রয়েছে বলে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সেসব পয়েন্ট আমরা সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। এর মধ্যে ৯৫ শতাংশ এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে আড়াআড়িভাবে দেওয়া বাঁধ অপসারণ করা হয়েছে।

জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক ও ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহ আলী বলেন, এরই মধ্যে প্রায় বাঁধ কেটে দিয়েছি। যেসব এলাকায় কাজ শেষ, সেগুলো এ মাসের মধ্যেই সরিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু যেসব খালে বেজমেন্ট ও ওয়ালের কাজ হয়নি, সেখান থেকে কাজ শেষ না করে ফিরলে ক্ষতি হয়ে যাবে। কিছু খালে মাটি থাকবে। তাতে জলাবদ্ধতা হবে না। কারণ পয়েন্টগুলোতে প্রয়োজনীয় পানি চলাচলের পথ রাখা হবে।

সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, সিডিএ বাঁধ সরানোর দাবি করলেও অনেক জায়গায় রিটেইনিং ওয়াল ও বেজমেন্ট নির্মাণের জন্য দেওয়া মাটি আছে। এগুলো সরিয়ে নিলে পরিস্থিতি হয়তো সহনীয় থাকবে। আর না সরালে যা হওয়ার তাই হবে।

জোয়ারেও তলিয়ে যায়: জোয়ারজনিত জলাবদ্ধতার কারণেও নগরের অনেক এলাকা তলিয়ে যায়। এই সমস্যা নিরসনে কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে যুক্ত খালগুলোর মুখে ৪০টি স্লুইচ গেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল পাঁচ বছর আগে। কিন্তু এখনও কোনোটির কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহ আলী বলেন, চারটি স্লুইচগেটের কাজ প্রায় শেষ। এ মাসেই এগুলো খুলে দেওয়া হবে। আর জুলাইয়ের মাঝামাঝি মহেশখালের স্লুইস গেটের কাজ শেষ হবে।