'একটা মাত্র পৃথিবী' স্লোগানকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে উদযাপিত হচ্ছে এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবস, যখন বর্ধিত জনসংখ্যা ও পরিবর্তিত উন্নয়ন চাহিদার চাপে পৃথিবীর স্বাভাবিক পরিবেশ হুমকির মুখে। বাংলাদেশ আজ পরিবেশ দূষণে সরাসরি আক্রান্ত। জনসংখ্যার অত্যধিক বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নিয়মনীতিহীন ব্যবস্থাপনায় পর্যুদস্ত আমাদের স্বপ্নের স্বদেশ, নবায়ন অযোগ্য জৈবপ্রাকৃতিক শৃঙ্খলা দিনের পর দিন ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই প্রতিকূল বিশ্ববাস্তবতায় পরিবেশ দূষণ ও আদর্শ পরিস্থিতি প্রসঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

আমরা এমন একটা পরিবেশ চাই, যেখানে নির্মল বাতাস সেবনে কোনো বাধা থাকবে না, যেখানে আমাদের নদীগুলোর প্রবাহ স্বচ্ছ হবে, যেখানে আমাদের খাদ্য হবে বিশুদ্ধ, যেখানে আমাদের নগর হবে বসবাসযোগ্য, আমাদের একটা কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা থাকবে। আমরা চাই আমাদের সংরক্ষিত এলাকা- যেমন সুন্দরবন, পাহাড়ি বন, শালবন এগুলো প্রকৃত অর্থেই সুরক্ষিত থাকবে, আমাদের পাহাড়গুলো কেউ কেটে ফেলবে না।
এটা অলীক বা অসম্ভব কোনো চাওয়া নয়। আমাদের যা আছে, সেগুলোকে রক্ষা করেই আমাদের দেশে যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হোক, যেন প্রাকৃতিক সম্পদগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এটাই হচ্ছে আমাদের চাওয়া।

অথচ আমরা এখন বসবাস করছি পৃথিবীর সবচেয়ে বসবাস অযোগ্য নগরীগুলোর একটিতে। আমাদের বাতাস পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত। বায়ুদূষণের কারণে বছরে প্রায় ২ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। প্রতিবছর নাগরিকদের গড় আয়ু থেকে ৫-৭ বছর কমে যাচ্ছে। তার মানে আমার মায়ের জীবন থেকে, আমার সন্তানের জীবন থেকে ৫-৭ বছর কমে যাওয়া। অনিয়ন্ত্রিত যানজটে আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় ব্যয় করতে হচ্ছে। আমাদের নদীগুলো বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নদীর তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। জলাশয় ভরাটের দিক দিয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশ শীর্ষস্থান দখল করেছে। আবার আন্তর্জাতিক নদী যেগুলো আমরা প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভাগাভাগি করি, সেগুলোতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় পৌঁছাতে পারিনি। নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশে বন উজাড়ের গড় হার ২.৬ শতাংশ, যেখানে বিশ্বে এই হার ১.৬ শতাংশ। আমাদের বহু স্তন্যপায়ী প্রাণী ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে। আরও প্রায় পাঁচশ প্রজাতি হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছে। এটাই হলো আমাদের আজকের বাস্তবতা।

আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে বনায়নের নামে উল্টো ক্ষতিকর আগ্রাসী প্রজাতির গাছ লাগানো হয়। অথচ ২০১৮ সালের পরিবেশ নীতিতে এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতেও এ কথা স্পষ্ট করে বলা আছে। কিন্তু আমাদের বন বিভাগ এখনও ১৯২৭ সালের বন আইনে পরিচালিত হয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে ব্রিটিশরা এ দেশে বন সংরক্ষণ করতে আসেনি, বনকেন্দ্রিক বাণিজ্য করতে এসেছে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, সেই বনকেন্দ্রিক বাণিজ্যকেই কেবল প্রসারিত করতে পারে এমন আইনের অধীনেই আমাদের বন সংরক্ষণ করা হয়। সেখানে বলা আছে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য যেটুকু বন প্রয়োজন, তার বাইরে বাকিটুকু বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা যাবে। কাজেই বনের বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে। এতে প্রাণ-প্রকৃতির মূল বিষয় জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে দিচ্ছে। এসব গাছ থেকে কাঠ পাওয়া যাচ্ছে; কিন্তু যে পাখিটা গাছটাতে গিয়ে বসত, সে আর সেখানে থাকতে পারছে না। কারণ ইউক্যালিপটাস, একাশিয়া, মেহগনি ইত্যাদির মতো আগ্রাসী গাছে পাখি থাকতে পারে না, এগুলোর ফলও বিষাক্ত।

বন বিভাগকে বনের বাণিজ্যিকীকরণ থেকে সরে এসে একটি প্রতিবেশ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। উচ্চ আদালত এরই মধ্যে শালবনে ইউক্যালিপটাস গাছ লাগানোর বিরুদ্ধে আদেশ দিয়েছেন।

এ থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি। প্রথমেই বুঝতে হবে-আমাদের অবারিত সম্পদ নেই, সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অল্প সম্পদের মধ্যেই আমাদের বুঝেশুনে সব কর্মকাণ্ড চালাতে হবে। তাই পরিবেশ দূষণের দায় জনগণের ঘাড়ে চাপানো যায় না। জনগণ নদীদূষণ করে, বন উজাড় করে, পাহাড় কাটে- এভাবে বলার সুযোগ নেই। এসব কাজে তারাই জড়িত থাকে, যারা ক্ষমতাকেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থান করে। প্রথম কথা হলো-আমাদের উন্নয়নের যে ধারা আছে, সেটিকে পুরোপুরি ঢেলে সাজাতে হবে, যাতে এটা প্রকৃতিবান্ধব, পরিবেশবান্ধব হয়। আমাদের উন্নয়ন হয় মানুষকেন্দ্রিক। আমাদের উন্নয়নটাকে করতে হবে প্রকৃতিকেন্দ্রিক। মানুষের জন্য উন্নয়ন করার সময় নদী ও বনের ক্ষেত্রে বলা হয়- এগুলো পরে দেখা যাবে, আগে উন্নয়নটা করে নিই। কিন্তু এর বিপরীতে প্রকৃতিকেন্দ্রিক উন্নয়ন হলেই মূলত সেটি হবে টেকসই উন্নয়ন।

কারণ এতে আপনার মূল সম্পদ নষ্ট হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, আমাদের উন্নয়ন দর্শনে এ জিনিসটা থাকতে হবে যে, যা আমি সৃষ্টি করতে পারি না, তা আমি ধ্বংসও করতে পারব না। আমরা ১০০ তলা বিল্ডিং নির্মাণ করতে পারি; কিন্তু একটা ধলেশ্বরী বা শীতলক্ষ্যা সৃষ্টি করতে পারি না। এ নদীগুলো জনগণের সম্পত্তি, উন্নয়নের জন্য আমরা তা ধ্বংস করতে পারি না।

তৃতীয়ত, আমাদের এই প্রজন্মই কেবল ভোগ করলে হবে না, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তা রেখে দিতে হবে। সেটাই হবে টেকসই উন্নয়ন। সেই টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের ওপর একটার পর একটা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অথচ এ নিয়ে আমাদের কিছুই জানানো হচ্ছে না। আমরা কোনো মতামত দিলে সেটিকে উন্নয়নবিরোধী বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

চতুর্থত, উন্নয়নের জন্য উন্নত বিশ্ব ইতোপূর্বে যেসব ভুল রাস্তায় গেছে, সেগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। উন্নত বিশ্ব যখন উন্নয়ন করেছে, তখন তো পরিবেশ সম্পর্কে তেমন সচেতনতা ছিল না, বিকল্প ছিল না। এখন তো বিকল্প আছে। আমাদের নিরাপদ বিকল্পের দিকে যেতে হবে। যেমন- তখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রই ছিল সমাধান। এখন তো সৌরবিদ্যুৎ চলে এসেছে। কাজেই উন্নয়নে পছন্দের ক্ষেত্রে আমাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
পঞ্চমত, ভোগবাদ। আমাদের প্রকৃতির প্রতি উদাসীন থাকা যাবে না। প্রকৃতির জন্য যা ক্ষতিকর সামগ্রী অবশ্যই তা বয়কট করতে হবে। পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। অবশ্যই এ খাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে।

আমাদের উন্নয়ন দর্শনে আরেকটা বিষয় থাকতে হবে- উন্নয়ন আর পরিবেশ পরস্পর সাংঘর্ষিক নয়; বরং সহযোগিতাপূর্ণ। তাই জলবায়ু বিধ্বংসী, প্রাণ-প্রকৃতি বিধ্বংসী উন্নয়ন করা যাবে না। প্রকৃতিকেন্দ্রিক উন্নয়নের স্বার্থে আমাদের উন্নয়নের পদ্ধতি ঠিক করে সেখানে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

বৃহৎ পর্যায়ে পরিবর্তনের জন্য অবশ্যই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। তবে ছোট বা ব্যক্তি পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ কিন্তু নেওয়া হয়েছে। এগুলো একেকটা দৃষ্টান্ত। রানা প্নাজা ট্র্যাজেডির কারণে বাংলাদেশের গার্মেন্ট খাত বিশ্বব্যাপী প্রশ্নের মুখে পড়েছিল, সেই খাতটি কিন্তু এখন বিশ্বের অন্যতম পরিবেশবান্ধব ক্ষেত্র। এটা একটা দৃষ্টান্ত হতে পারে। আরেকটা দৃষ্টান্ত হতে পারে- আমাদের দেশে এখন অনেক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা অর্গানিক ফার্মিংয়ে এগিয়ে আসছেন। তাঁরা বলছেন যে, আমরা সার এবং কীটনাশক দেব না। এজন্য কিন্তু সরকার তাঁদের পুরস্কৃতও করছে। আবার অনেক গ্রামে ছেলেমেয়েরা পাখিদের অভয়াশ্রম তৈরি ও সংরক্ষণে কাজ করছে। এগুলো প্রকৃতিকেন্দ্রিক উন্নয়নের একেকটা দৃষ্টান্ত। খুব ধীরগতিতে হলেও নদীর তীরে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ কিন্তু সম্ভব হয়েছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে। এটাও একটা উদাহরণ।

আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের পানি, মাটি, বাতাস, বনকে কোনোভাবেই উজাড় বা দূষিত হতে দেওয়া যাবে না। সেগুলোকে আস্তে আস্তে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আমরা ইকো-ট্যুরিজম নিয়ন্ত্রণ করিনি। জাফলং প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত, সেন্টমার্টিনও ধ্বংসের পথে। এগুলো নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে বন্ধ রেখে আগে প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। তারপর আবার চালু করা যাবে।

উন্নয়নকে টেকসই করতে তিনটি বিষয় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এক. তথ্যের অধিগম্যতা। জনগণকে তথ্য দিতে হবে। জনগণের মধ্যে অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। দুই. জনগণের অংশগ্রহণ। জনগণের মতামত নিয়ে তবেই উন্নয়ন হবে। তিন. ন্যায়বিচার। প্রাণ-প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা এমন আশঙ্কা সৃষ্টি হলে তার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

সর্বোপরি পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা থেকে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ভীষণ জরুরি। ২০০৪-০৫ সালে আমাদের দেশে পলিথিন প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছিল না। আবার পলিথিন বাজার দখল করে নিয়েছে। তাই আমাদের সচেতন থাকতে হবে, সোচ্চার থাকতে হবে। নিজেদের জন্য, ভবিষ্যতের জন্য।