আমাদের দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের মধ্যে কিডনি অন্যতম। দেখতে অনেকটা শিমের বিচির মতো এই অঙ্গ মানবদেহে এক জোড়া থাকে। দেহের অপ্রয়োজনীয় পানি, খনিজ লবণ ও বিপাক ক্রিয়ায় উৎপন্ন বর্জ্য পদার্থগুলোকে বের করার মাধ্যমে দেহের পানি ও প্রয়োজনীয় খনিজ লবণগুলোর ভারসাম্য বজায় রাখে। কিছু প্রয়োজনীয় হরমোন তৈরির মাধ্যমে রক্তের লোহিত কণিকা উৎপাদন, ক্যালসিয়ামের ভারসাম্য বজায় রাখার মাধ্যমে সুষ্ঠু হাড় গঠন ও দেহের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ রাখতে সহায়তা করে। কিন্তু এই কিডনি যখন তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারায়, তখন দেহে ঘটে নানা বিপত্তি। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, জন্মগত ত্রুটি, বংশগত রোগ, নেফ্রাইটিস, ব্যথানাশক ওষুধ সেবনসহ নানা কারণে বিশ্বে ধীরগতির কিডনি বিকল রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে।

কিডনি রোগীদের মধ্যে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বা দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ অন্যতম। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ হচ্ছে এর প্রধানতম কারণ। এ রোগে আক্রান্ত প্রায় ৪০ শতাংশ ডায়াবেটিসজনিত কারণে ও প্রায় ২০ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপজনিত কারণে হয়ে থাকে। এ ছাড়া গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস, পাইলোনেফ্রাইটিস, বারবার মূত্রনালি বা কিডনি সংক্রমণ প্রভৃতি কারণে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ হতে পারে।

একিউট কিডনি ইনজুরি বা স্বল্পমেয়াদি কিডনি বৈকল্য সাধারণত দীর্ঘমেয়াদে ব্যথানাশক সেবন, চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত ওষুধ সেবন বিশেষ করে যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারের কারণে হতে পারে। তাছাড়া বিভিন্ন বিষক্রিয়ায়, তীব্র পাতলা পায়খানা বা বমিজনিত কারণে সৃষ্ট পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, শরীরে তীব্র আঘাত, তীব্র জীবাণু আক্রমণ প্রভৃতি নানা কারণে দেখা দিতে পারে এই আকস্মিক কিডনি বৈকল্য।

সারাবিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ নানা কারণে কিডনি জটিলতায় ভুগছেন। প্রায় আড়াই কোটি মানুষ প্রতি বছর দীর্ঘমেয়াদি কিডনি জটিলতায় প্রাণ হারান। এই হার সারাবিশ্বে দ্রুত বর্ধনশীল মৃত্যুজনিত কারণগুলোর মধ্যে ষষ্ঠতম। এই জটিলতা ও মৃত্যুহার দিনকে দিন বেড়েই চলছে। কিডনি রোগীদের মধ্যে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বা দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ অন্যতম। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ হচ্ছে এর প্রধানতম কারণ। এ রোগে আক্রান্ত প্রায় ৪০ শতাংশ ডায়াবেটিসজনিত কারণে ও প্রায় ২০ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপজনিত কারণে হয়ে থাকে। এ ছাড়া গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস, পাইলোনেফ্রাইটিস, বারবার মূত্রনালি বা কিডনি সংক্রমণ প্রভৃতি কারণে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ হতে পারে।

একিউট কিডনি ইনজুরি বা স্বল্পমেয়াদি কিডনি বৈকল্য সাধারণত দীর্ঘমেয়াদে ব্যথানাশক সেবন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন বিশেষ করে যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারের কারণে হতে পারে। তাছাড়া বিভিন্ন বিষক্রিয়ায়, তীব্র পাতলা পায়খানা বা বমিজনিত কারণে সৃষ্ট পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, শরীরে তীব্র আঘাত, তীব্র জীবাণু আক্রমণ প্রভৃতি কারণে দেখা দিতে পারে এই আকস্মিক কিডনি বৈকল্য।

একটু সচেতন হলে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন প্রাথমিক অবস্থায় কিডনি রোগের উপস্থিতি ও এর কারণ শনাক্ত করে তার চিকিৎসা করা। দীর্ঘমেয়াদি কিডনি জটিলতায় প্রাথমিক অবস্থায় দেহে সাধারণত কোনো উপসর্গ দেখা দেয় না বলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগীরা ব্যাপারটাকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চান না। যখন রোগী উপসর্গগুলো যেমন শরীরে পানি আসা, মুখ ফুলে যাওয়া, প্রসাব কম হওয়া, দুর্বলতা, অরুচি প্রভৃতি টের পান, তখন উভয় কিডনির কার্যক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে আসে এবং কিডনির স্থায়ী ক্ষতি শুরু হয়ে যায়। ফলে রোগের প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই এ চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনে সক্ষম নন। তাই কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে জানা এবং এ জন্য নিয়মিত পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি। কিডনির রোগ প্রতিরোধযোগ্য। এ জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। প্রাথমিক অবস্থায় এ রোগের কারণ নির্ণয় করা গেলে চিকিৎসার মাধ্যমে কিডনি বিকল হওয়া প্রতিরোধ করা যায়। কিডনিকে সুস্থ রাখতে ও জটিলতা এড়াতে তাই আমাদের নিচের কথাগুলোকে জানতে ও মানতে হবে।

- যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি কিডনি জটিলতার অন্যতম প্রধান কারণ ডায়াবেটিস, তাই ডায়াবেটিস হলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখুন। নিয়মিত রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা, প্রসাবে অ্যালবুমিনের পরীক্ষা ও সিরাম ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করা জরুরি। সেই সঙ্গে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে ডায়াবেটিসের ওষুধ সেবন বা ইনসুলিন নিতে হবে।

-উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা বর্জন থেকে বিরত থাকুন।

-কথায় কথায় ব্যথানাশক সেবন করা থেকে বিরত থাকুন।

-একটু ঠান্ডা, সর্দি, জ্বর, পাতলা পায়খানা হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে অথবা ওষুধ বিক্রেতা অথবা অন্য কারও পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের বদভ্যাস আজই পরিহার করুন।

- বমি বা পাতলা পায়খানা হলে অবশ্যই সঠিক নিয়মে ও সঠিক মাত্রায় ওরস্যালাইন খাবেন।

-সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শরীরচর্চা করুন।

-শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

- ধূমপানের অভ্যাস থাকলে তা ত্যাগ করুন।

- দীর্ঘ সময় প্রস্রাব আটকে রাখার প্রবণতা ত্যাগ করুন।

-গরুর মাংস বা এই ধরনের প্রাণিজ আমিষ খেলে কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এমনকি চিপস, ফাস্টফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ইন্সট্যান্ট নুডলস এবং লবণ দিয়ে ভাজা বাদামও কিডনির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। খাবার তালিকায় অতিরিক্ত প্রোটিন থাকলে কিডনির ওপর চাপ পড়ে এবং কিডনির দুর্বল কোষগুলোর ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই প্রাণিজ প্রোটিন এড়িয়ে খাবার তালিকায় ডাল জাতীয় প্রোটিন রাখতে হবে। এ ছাড়া মাছ খাওয়া যেতে পারে।

- পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে হবে। কিডনি ভালো রাখতে প্রতিদিন অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি বা তরল খাবার খাওয়া উচিত। অতিরিক্ত ঘাম ঝরলে পানি খাওয়ার পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি খেলে কিডনিতে পাথর হয় না এবং এর স্বাভাবিক কার্যক্রম ঠিক থাকে। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ না থাকলে নিয়মিত তা পরীক্ষা করুন। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই দুটো রোগ উপসর্গবিহীন থাকে।

- অনেকেই পানির বদলে কোমল পানীয় বা বিভিন্ন রকমের এনার্জি ড্রিংকস খেয়ে থাকেন। এ ধরনের পানীয়গুলো কিডনির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই কোমল পানীয় এড়িয়ে চলুন এবং যখনই তৃষ্ণা পায় পানি খেয়ে নিন।

-সম্ভব হলে চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান।

- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকুন। পরিপূর্ণভাবে না জেনে লতাপাতা, গাছগাছড়া তথা টোটকা চিকিৎসা থেকে বিরত থাকুন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক গবেষণার ফসল। প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন গবেষণায় বিভিন্ন ওষুধের কার্যকারিতা প্রমাণ সাপেক্ষেই কেবল তা প্রয়োগের জন্য নির্ধারিত হয়।

[কনসালট্যান্ট, ডায়াবেটিস ও এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, ইমপালস হাসপাতাল, তেজগাঁও, ঢাকা ]