একদিন আগেও প্রিয় বাবার কোলে উঠেছিল ১০ মাস বয়সী শিশু মো. আলী ইমরান। বাবার মুখে দুই হাত বুলিয়ে আদর করেছে, গালে দিয়েছে চুমুও। কিন্তু আগুনের ভয়াবহতায় প্রিয় বাবার হাত, বুক, মাথাসহ বিভিন্ন স্থানে মোড়ানো কেবল সাদা ব্যান্ডেজ আর ব্যান্ডেজ। বাবার এমন অবস্থা দেখে আঁতকে উঠে ছোট্ট শিশু ইমরান। যে বাবাকে দেখলে কোলে উঠতে কান্নাকাটি করতো, সেই ইমরান এখন বাবার দিকে চোখ পড়তেই চিৎকার করে কান্না করছে। 

চট্ট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩১ নম্বর গাইনি ওয়ার্ডে আগুনে ঝলসে যাওয়া সালাউদ্দিন এখন যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। আর বাবার এমন অবস্থা দেখে অঝোরে কাঁদছে শিশু ইমরান। 

বার্ন ইউনিটজুড়ে এখন আগুনে পোড়া গন্ধ। এখানে রোগীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তাই ইউনিটের পাশে ৩১ নম্বর গাইনি ওয়ার্ডে নতুন একটি ইউনিট খোলা হয়েছে। আর সেখানেই যন্ত্রণায় ছটফট করছেন সালাউদ্দিনের মতো প্রাণে বেঁচে যাওয়া আরও অনেকেই। 

স্বামীর এই অবস্থায় অঝোরে কাঁদছেন সালাউদ্দিনের স্ত্রী পারভীন আক্তারও। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি সমকালকে বলেন, ‘এ কী হয়ে গেল ওর? তার যন্ত্রণা আর সইতে পারছি না। তাকে এভাবে দেখে আমার ছোট্ট শিশু ইমরান আঁতকে উঠছে। বাবার দিকে তাকাতেই শুধু কান্না করছে। কাজ করতে গিয়ে একি হয়ে গেল ওর। আল্লাহ আমাকে এতবড় শাস্তি কেন দিল।’ 

প্রাণে বেঁচে যাওয়া মো. সালাউদ্দিন ওই ডিপোতে কনটেইনার হ্যান্ডেলিং এর কাজ করতেন। প্রতিদিনের মতো শনিবার রাতেও ডিপোতে কর্মরত ছিলেন তিনি। কাজের একপর্যায়ে ভয়াবহ বিস্ফোরণে আগুনে দগ্ধ হন তিনি। আগুনে তার, দুই হাত, বুক, মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক জখম হয়েছে। 

মো. সালাউদ্দিন চট্টগ্রাম নগরের মধ্যম হালিশহর এলাকার বাসিন্দা। তার তিনটি ছেলে রয়েছে। তাদের সবার ছোট ইমরান। বাকি দুজনের মধ্যে বড় ছেলে মো. আলী নূরের বয়স ছয়। আর মেজ ছেলের বয়স দুই বছর। বাবার এমন করুন অবস্থা দেখে তারাও কাঁদছে অঝোরে। 

সালাউদ্দিনের স্ত্রী পারভীন আক্তার বলেন, ‘সামান্য বেতনে চাকরি করেন তিনি। হাতে কোনো জমা টাকা নেই। কীভাবে তাকে সুস্থ করে তুলবো তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছি। এখন হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু পরে কী করব আমরা।’

হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে নতুন অস্থায়ী বার্ন ইউনিটে সালাউদ্দিনের মতো প্রাণে বেঁচে যাওয়া গুরুত্বর আহত মো. সোহেল, মো. হোসেন, মো. সিরাজ, মো. বিল্লাল, আমান, লোকমানসহ আরও অনেকেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আগুনের ভয়াবহতায় এদের কারও পা, কারও হাত, কারও মুখ, কারও শরীরের বেশিরভাগ অংশই পুড়ে গেছে। কাজ শেষ করে প্রতিদিনের মতো তাদের কেউ বাড়িতে কিংবা বাসায় স্ত্রী-সন্তানদের কাছে ফেরার কথা থাকলেও এদের স্থান হয়েছে এখন হাসপাতালে। যন্ত্রণায় ছটফট করছেন সেখানে।