চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) দূরত্ব ৬ কিলোমিটার। কিন্তু এতদূর থেকে শোনা গেল কন্টেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণের সেই বিকট শব্দ। শনিবার রাতে বিস্ফোরণের পর একের পর এক যখন হতাহতের খবর আসতে থাকে তখন বাড়তে থাকে বেঁচে যাওয়া মানুষের রক্তের চাহিদাও। আর তাই বিস্ফোরণের বিকট শব্দ আর ঘুমাতে দেয়নি চবির আবাসিক হলগুলোতে থাকা শিক্ষার্থীদেরও।

মধ্যরাতেই রক্ত দিতে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভিড় জমান সেই শিক্ষার্থীরা। হাসপাতালের করিডোরের যেখানে ‘রক্ত চাই’ প্লাকার্ড দেখা গেছে, সেখানেই হাজির হয়েছেন তারা। চট্টগ্রামের বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক রক্তদান সংগঠন ‘কণিকা’। এই সংগঠনের ব্যানারে রক্ত দিয়েছেন চবির শিক্ষার্থীরা। একইসঙ্গে দগ্ধদের সেবাশুশ্রূষায় নিজেদের উজাড় করে দেন তারা।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিএম কন্টেইনার ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় মধ্যরাতে বাড়ছিল আহতের সংখ্যা। অ্যাম্বুলেন্সের শব্দে ভারী হচ্ছিল চমেক হাসপাতাল। ওষুধের পর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল রক্তের। রক্তের প্রয়োজনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে একে বাড়ছিল পোস্ট।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট করা হয় ‘রক্ত দিতে চমেকে যারা যাবেন, এগিয়ে আসুন।’ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট মুহূর্তেই ভরে যায় রক্তদানে আগ্রহী শিক্ষার্থীতে। বাসে করে ক্যাম্পাস থেকে চমেক হাসপাতালে চলে যান রক্ত দিতে আগ্রহী অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী।

তারা অপেক্ষা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্টে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও আরেকটি বাসের ব্যবস্থা করতে পারেনি তারা। অন্যদিকে চমেকে বাড়ছিল নেগেটিভ রক্তের সংকট। বাসের জন্য অপেক্ষা না করেই ট্রাকে করেই রওনা দেন শিক্ষার্থীরা।

যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী নুর নবী রবিন বলেন, আমরা রক্তের জন্য আহ্বান করার সঙ্গে সঙ্গে জিরো পয়েন্টে শতাধিক শিক্ষার্থী সমবেত হই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো বাস পাইনি। এ অবস্থায় কেবল নেগেটিভ ব্লাড ডোনারদের নিয়ে ট্রাকে করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই। তবে জেনেছি এর আগে একটি বাস ক্যাম্পাস থেকে শহরে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর ড. রবিউল হাসান ভূঁইয়া বলেন, রাতে শিক্ষার্থীরা শহরে যেতে বাসের জন্য আমাকে কল দিয়েছিল। তবে সে সময় চালক ছিল না বলে আমরা বাস দিতে পারিনি। শিক্ষার্থীরা নিজেরা একটা বাস নিয়ে গিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্সগুলো তারা ব্যবহার করেছে।

শুধু চবির শিক্ষার্থী নয়; মধ্যরাতে রক্ত দিতে এগিয়ে আসেন চট্টগ্রামের সব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ‘কণিকার’ সদস্যরা সারারাত ছিলেন চমেকের প্রাঙ্গণে।

কণিকার সাধারণ সম্পাদক ফরহাদুল ইসলাম বলেন, ‘মধ্যরাত হোক কিংবা দিনের আলো, রক্তদানে তরুণদের এগিয়ে আসা উচিত। আমরা সেই কাজেই নিয়োজিত। রাতে সেখানে রক্তের প্রয়োজন বেড়ে যায়, বিশেষ করে নেগেটিব রক্ত। প্রথমে তালিকাভুক্তদের আহ্বান করে কাজ শুরু করি আমরা। পরবর্তীতে অনেকেই সাহায্যের জন্য ছুটে আসেন।’

ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশের জনসংযোগ কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা রাতেই সেখানে সাহায্যের জন্য ছুটে যাই। সেখানে প্রথমেই রক্তের প্রয়োজন দেখা যায়। তাই আমরা আমাদের ব্লাডের ডাটাবেজ পাবলিক করে দেই। এছাড়া রক্ত সংগ্রহেও আমরা সাহায্য করি। শুধু তাই নয়; ডোনারদেরও আমরা সাহায্য করি কীভাবে কোন দিকে যেতে হবে যেন সময়টা বাঁচে।’

তিনি আরও বলেন, রক্ত দানে সহায়তায় এগিয়ে আসে শহরের তরুণেরা। রেড ক্রিসেন্ট, গাউসিয়া কমিটি, স্কাউট, বিদ্যানন্দ ও বিএনসিসিসহ সকল সংগঠন মধ্যরাত থেকেই রক্তের প্রয়োজনে সাহায্য করে গেছে।

সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার প্রতিষ্ঠানটি মূলত পণ্য রপ্তানিতে কাজ করে। এখান থেকে পণ্য রপ্তানির জন্য কনটেইনারগুলো প্রস্তুত করে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো হয়। ৩৮ ধরনের পণ্য রপ্তানিতে কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। ঘটনার সময় সেখানে ৫০ হাজার কনটেইনার ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় অন্তত ২০০ শ্রমিক সেখানে কাজ করছিলেন বলেও জানা গেছে। তবে সেখানে ঠিক কত সংখ্যক মানুষ তখন ছিলেন তা এখনো সঠিকভাবে জানা যায়নি। বিস্ফোরণে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৪৯ জন।

চমেক পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপপরিদর্শক মো. আলাউদ্দিন সমকালকে জানান, নিহতদের মধ্যে ৭ জন ফায়ার সার্ভিসের কর্মী। আগুন নেভাতে গিয়ে জীবনই নিভে গেছে তাদের। এছাড়া ফায়ার সার্ভিসের অন্তত ২০ জনসহ দুই শতাধিক লোক আহত হয়েছেন। তাদের তাদের অধিকাংশই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) চিকিৎসা নিচ্ছেন। নিখোঁজ রয়েছেন আরও অনেকে।