আজকাল অদ্ভুত এক সমস্যায় পড়েছেন রাশেদ-নওশিন দম্পতি। তাঁদের একমাত্র সন্তান রিশান হাসে না। যেন তাকে আনন্দ দিতে পারে না জগতের কোনো কিছুই। রিশান এখন আর আগের মতো খেতে চায় না। তার নাকি খেতে ভালো লাগে না; হজম হয় না। বুক জ্বালাপোড়া করে। সবে ১৪ বছরে পা দেওয়া ছেলেটি কখনও মুগ্ধ চোখে তাকায় না। সে যেন কৌতূহলশূন্য, আবেগশূন্য কোনো মানব। জগতের কোনো কিছুর প্রতি তার আগ্রহ নেই। এটা অবশ্য আংশিক সত্য। তার আগ্রহ শুধু একটা জিনিসকে ঘিরেই- স্মার্টফোন। দিনের প্রায় পুরোটা সময় সে স্মার্টফোন হাতে নিয়ে কাটায়।

হাত থেকে মোবাইল ফোন রাখতে বললে অথবা একটু বকাঝকা করলেই চিৎকার করে ঘর মাথায় তোলে রিশান। মা-বাবা কিংবা বাসার অন্য সবার সঙ্গে শুরু করে যাচ্ছেতাই ব্যবহার। মুখে মুখে তর্ক করে। এমনকি কয়েকবার রাশেদের অনুপস্থিতিতে নওশিনের দিকে তেড়ে মারতে পর্যন্ত গিয়েছিল রিশান। হাজার চেষ্টাতেও ঘুম পাড়ানো যায় না রিশানকে। বিছানায় শুয়ে ছটফট করে। ছেলের চিন্তায় কপালের ভাঁজ গাঢ় হয় রাশেদের। অসুস্থ হয়ে পড়েন নওশিন।

রিশানের মতো কিশোর-কিশোরীরা ইদানীং মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। পাবজি, ফ্রি ফায়ার, কয়েক রকমের সিম্যুলেটর গেম, ফেসবুক, টিকটক আরও কত কিছু! এর ফলাফল হচ্ছে ভয়াবহ। ডিজিটাল ডিভাইসগুলোকে ওরা কন্ট্রোল না করে বরং ডিজিটাল ডিভাইসগুলোই ওদের কন্ট্রোল করছে।

আজকাল আবাসিক এলাকার বাসাবাড়ির নিচে বিকেলবেলা স্কুলপড়ুয়া ছেলেদের হৈ-হল্লা শোনা যায় না। এখন ক্রিকেট বলে কোনো ঘরের জানালার কাচ ভাঙে না। পাড়ার রগচটা বুড়ো মানুষও বকার জন্য গলির মুখে কোনো ডানপিটে কিশোরের দল খুঁজে পান না। রাতে ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে এখন আর কেউ গলিতে দল বেঁধে ছুটে বেড়ায় না। এখন আর কেউ তেমন ঘুড়ি উড়ায় না। পকেটভর্তি মারবেল ঝুমুর ঝুমুর বাজিয়ে কোনো কিশোর আর এখন ছোটাছুটি করে না। কেউ 'তিন গোয়েন্দা', 'আবোল-তাবোল' কিংবা 'হরফের ছড়া' পড়ে না। ছেলেমেয়েদের জীবনযাপনের সবটুকুই স্মার্টফোনের একটা স্ট্ক্রিনে সীমাবদ্ধ।

স্মার্টফোনের এই অতিরিক্ত ব্যবহার কিশোরদের মধ্যে তৈরি করছে হতাশা, বিষণ্ণতা, হীনমন্যতা, স্বার্থপর মানসিকতা, খিটখিটে মেজাজ, একাকিত্ব। তাদের মধ্যে আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে নৈতিক মূল্যবোধ; বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। বাড়ছে কিশোর অপরাধ, পারিবারিক অশান্তি।

শিশু-কিশোরদের রোগের ধরনও বদলে দিচ্ছে স্মার্টফোনের এই অতিরিক্ত ব্যবহার। দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি হ্রাস, মাথাব্যথা, মুখে অরুচি, ঘুম কম হওয়া, ঘাড়ব্যথার মতো সমস্যা বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে প্রকট হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া স্মার্টফোনের ব্যবহার শিশু-কিশোরদের মস্তিস্কের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
এই স্মার্টফোনে আসক্তির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বছর দুয়েকের করোনাকালীন স্থবিরতা। ঘর থেকে বেরোনো বন্ধ। খেলাধুলার সব রকমের উপায় বন্ধ। স্বজনের সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগ, অফিস, ক্লাস, বিনোদন কিংবা লকডাউনের একঘেয়ে স্থবিরতার মাঝে মানসিক প্রশান্তি- সব প্রয়োজনের একমাত্র সলিউশন ইন্টারনেট আর স্মার্টফোন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাকালীন স্থবিরতায় প্রায় ৬৮ শতাংশ শিশু-কিশোর স্মার্টফোনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। অভিভাবকদের উদাসীনতাও এ ক্ষেত্রে একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। নাগরিক জীবনে সন্তানদের ঠিকঠাক সময় দিতে না পারা; শিশু সন্তানকে শান্ত করতে যখন-তখন হাতে স্মার্টফোন ধরিয়ে দেওয়া; ইউটিউবে ভিডিও দেখানো কিংবা নিজেদের স্মার্টফোনে আসক্তি সন্তানদেরও একসময় স্মার্টফোনে আসক্ত করে তোলে।

কিশোরদের স্মার্টফোনে আসক্তির আরেকটি বড় কারণ হলো পর্যাপ্ত খোলা জায়গার অভাব। শহরাঞ্চলের শিশু-কিশোররা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইচ্ছা হলেও খোলা মাঠে ছুটতে পারছে না। একসঙ্গে হইচই করতে পারছে না। শহরের বুকে আকাশছোঁয়া দালানকোঠা আছে, আলোকিত শপিংমল আছে; সিনেমা হল আর গলি-ঘুপচি আছে; অ্যামিউজমেন্ট পার্ক আছে। কিন্তু এক টুকরো খোলা মাঠ পাওয়া দুস্কর। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেজওয়ানুল হক কাজ করছেন জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ নিয়ে। তিনি বলেন, 'স্মার্টফোনের প্রতি সবার এই অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে গাঢ় অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য দুটোই বড় ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।'

তিনি আরও বলেন, 'তাদের সবচেয়ে বড় সাপোর্টটুকু দিতে পারেন মা-বাবা, ভাই-বোনসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। এটা সময়সাপেক্ষ ও ধৈর্যের ব্যাপার। তাদের প্রতিদিন যথেষ্ট সময় দেওয়া, গল্প করা; তাদের মাঝে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করা; কখনও একাকিত্ব অনুভব করতে না দেওয়া; বিকেলে খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করা; তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা; শিশুদের নিয়ে নিয়মিত হাঁটতে বেরোনো- এসব কাজ ধীরে ধীরে তাদের স্মার্টফোনে আসক্তি কমিয়ে স্বাভাবিক, সুস্থ ও সুন্দর জীবনের দিকে ধাবিত করবে।'

বিষয় : ডিভাইস আসক্তি

মন্তব্য করুন