অনেকটা লেজ হারানো শেয়ালের গল্পের মতো। ফাঁদে আটকা পড়ে লেজ গেছে; অন্যদের লেজ থাকতে দেব না। নিজে দালাল ধরে ৮-১০ বছর আগে কিডনি বিক্রি করে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। চেনা পথঘাটে এখন নিজেই দালাল বনে গেছেন। বয়সের কারণে বাবা পারছেন না, হাল ধরেছেন ছেলে। জেল থেকে বেরিয়েও ফের কিডনি বিক্রির দালালি করছেন। এভাবেই নতুন-পুরোনো দালালে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় আবারও জমে উঠেছে ভয়ংকর কিডনি বেচাকেনা।
ঢাকায় বসে পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে একটি চক্র। তাদের শক্ত নেটওয়ার্ক এখন উপজেলার ৩৫টি গ্রামে পৌঁছে গেছে। এসব গ্রামের অর্ধশতাধিক ব্যক্তি গত ১৮ মাসে তাঁদের কিডনি বিক্রি করেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গত দুই মাসে ১৮ দালালকে গ্রেপ্তার করেছে। এর পরও থেমে নেই তৎপরতা। দালালের খপ্পরে পড়ে রাতারাতি ধনী হওয়ার লোভে একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনি বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের ভেরেন্ডি গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য জিয়াউর রহমান বাদশা সমকালকে বলেন, কিডনি কেনাবেচা চলে প্রকাশ্যে। পরীক্ষা করলে গ্রামের অর্ধেক মানুষেরই একটি কিডনি পাওয়া যাবে না। প্রতিদিন দলে দলে লোক কিডনি বিক্রির জন্য ঢাকা যাচ্ছেন। কিডনি বিক্রি করা অনেকেই এখন দালালি করছেন।

উপজেলার চৌমুহনী বাজারের আবদুল জলিল বলেন, প্রশাসন ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তৎপর হওয়ায় কিডনি বেচাকেনা মোটামুটি বন্ধ ছিল। কিন্তু নতুন করে ফের এ ব্যবসা জমে উঠেছে। অভাব নয়, অনেকে দ্রুত ধনী হতে কিডনি বিক্রি করছেন। দালালের মাধ্যমে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে কার্যক্রম।
কালাইয়ের কিডনি বেচাকেনার দালাল জহুরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বর্তমানে ঢাকায় বসে কিডনি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তিনি ঢাকায় এ চক্রের মহাজন হিসেবে তারেক হোসেন, সাইফুল ইসলাম, শাহরিয়ার ইমরান, রাইহান হোসেনের নাম জানালেও বিস্তারিত বলতে রাজি হননি। ওইসব মহাজনের হয়ে ডোনার সংগ্রহে এলাকার নতুন-পুরোনো অনেক দালাল কাজ করছেন বলে দাবি জহুরুলের।
পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী জানান, ২০১১ সালের দিকে আত্মীয়ের চিকিৎসার জন্য ঢাকা যান কালাইয়ের জয়পুর বহুতি গ্রামের আবদুস সাত্তার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে তারেক হোসেনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। এক পর্যায়ে অর্থের লোভে তারেকের মাধ্যমে একটি কিডনি বিক্রি করেন আবদুস সাত্তার। এরপর তাঁকে কাজে লাগিয়ে কালাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কিডনি বেচাকেনার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন তারেক। মাদ্রাসার পিয়ন আবদুস সাত্তার দালালি করে রাতারাতি সম্পদশালী হয়ে ওঠেন। অবশ্য গত ১৪ মে আবদুস সাত্তার ও ৩০ মে তাঁর ছেলে নুর আফতাবকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত উপজেলার ৩৫ গ্রামের পাঁচ শতাধিক মানুষ কিডনি বিক্রি করেছেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কালাইয়ের মাত্রাই, উদয়পুর, ধুনট ও পূর্বকৃষ্টপুর, পুনট, দেউগ্রাম, আহম্মেদাবাদ ও পৌর এলাকার অন্তত ৩৫টি গ্রামে কিডনি কেনাবেচার শক্ত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন ঢাকার মহাজন ও তাঁদের স্থানীয় দালালরা। ভেরেন্ডি গ্রামের সেলিনা বেগম, তার স্বামী মেহেরুল, দেবর শাহারুল ও তাঁর স্ত্রী জোসনা, শ্বশুর জাহান আলমসহ পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যই কিডনি বিক্রি করেছেন।
কালাই উপজেলার বহুতি গ্রামের মোশারফ হোসেন ২০১১ সালে দালালের সঙ্গে ৪ লাখ টাকা চুক্তিতে একটি কিডনি বিক্রি করেন। ২ লাখ টাকা অগ্রিম নিয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে গেলে তাঁর কিডনি অন্যের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। নামমাত্র চিকিৎসা শেষে তিনি বাড়ি ফিরে এলেও বাকি টাকা পাননি। ক্ষোভ থেকে নিজে দালাল বনে যান। বয়সের কারণে ছেলে জহুরুল ইসলামকে এ কাজে যুক্ত করেছেন। জহুরুল ঢাকায় নতুন মহাজন খুঁজে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগীরা জানান, স্থানীয় দালালরা অভাবী মানুষ টার্গেট করে প্রথমে টাকা ধার দেন। এক পর্যায়ে সেই টাকা দিতে না পারলে কিডনি বিক্রির প্রস্তাব দেন। ফাঁদে ফেলে গ্রহীতার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিলেও ডোনারকে দালালরা দিচ্ছেন যৎসামান্য।

সম্প্রতি কিডনি বিক্রি করা বোড়াই গ্রামের নাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, সংসারে অভাবের কারণে দালাল কাইছারের সঙ্গে ঢাকায় যাই। ৫ লাখ টাকা চুক্তিতে ভারতে গিয়ে ঢাকার এক ব্যবসায়ীকে কিডনি দেই। বাড়ি এসে কাজকর্ম করতে পারছি না। ভয়ে চিকিৎসকের কাছেও যেতে পারছি না। এলাকার অনেকেই কিডনি দিতে এখন ঢাকা ও ভারতে রয়েছেন।

জয়পুরহাট জজ কোর্টর সরকারি কৌঁসুলি নৃপেন্দ্রনাথ মণ্ডল বলেন, আইনে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেনাবেচা নিষিদ্ধ। বিক্রি কিংবা সহায়তায় সর্বোচ্চ ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও কমপক্ষে ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু কোথাও আইনের প্রয়োগ হচ্ছে না।

কালাই থানার ওসি এস এম মঈনুদ্দীন বলেন, কিডনি বিক্রি বন্ধে যা যা দরকার, সবই করা হচ্ছে। দালাল ও বিক্রেতা ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ পর্যন্ত কিডনি সংক্রান্ত ব্যাপারে কালাই থানায় ১৫টি মামলা হয়েছে। গত দুই মাসে বিভিন্ন অভিযানে ১৮ দালাল গ্রেপ্তার হয়েছেন।
জয়পুরহাট জেলা প্রশাসক শরীফুল ইসলাম বলেন, কিডনি কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত স্থানীয় দালাল ছাড়াও হোতাদের আইনের আওতায় আনতে কাজ চলছে। সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রশাসনকে স্থানীয়রা সহায়তা না করলে এটি নির্মূল করা যাবে না।