পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তেই এখন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। সেতুর ওপর দিয়ে চলাচলের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। 

দেশের উত্তরাঞ্চল মঙ্গা কবলিত এলাকায়  যমুনা নদীর উপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের ফলে মঙ্গা নামটি মুছে গেছে। অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাড়িয়েছে উত্তরের মানুষ। ঠিক তেমনি পদ্মা নদীর উপর স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ব্যাপক আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ঘটবে, বদলে যাবে তাদের জীবনযাত্রার মান, সমৃদ্ধ হবে জনপদ। 

এরই মধ্যে ফরিদপুর অংশের পদ্মা সেতুর মহাসড়কের এক্সপ্রেসওয়ে ও সংযোগ সড়কের কাজ শেষ হয়েছে এবং চলাচলের জন্য খুলেও দেওয়া হয়েছে। অপেক্ষা শুধু পদ্মা সেতু দিয়ে পারাপারের। সেতুটি দিয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলা সরাসরি ঢাকার সঙ্গে যুক্ত হবে। যাতায়াতে সুবিধার পাশাপাশি এই সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ পুরো দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে অভিমত অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে বছরের একটি সময় মঙ্গা দেখা দিতো। ওই সময় মানুষ না খেয়ে মারা যেত। কিন্তু যমুনা নদীর উপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মানের ফলে ওই এলাকা থেকে মঙ্গা নামক শব্দটি দূর হয়ে গেছে। তারা এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। এখন আর কেউ খাবারের অভাবে মারা যায় না। সেতু চালু হওয়ার পর উত্তরবঙ্গের অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। ঠিক তেমনি পদ্মা নদীর উপর পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনমানের দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটবে, আমূল বদলে যাবে তাদের জীবনযাত্রা।

তিনি আরও বলেন, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর এপারের জেলাগুলোতে সরাসরি প্রাকৃতিক গ্যাস আসার পরিকল্পনা রয়েছে।  শিল্পপতি ও উদ্যোক্তারা ইতিমধ্যেই ফরিদপুরে শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য বিভিন্ন স্পটে জমি কিনে স্থাপনা নির্মানের কাজ শুরু করেছেন। ফরিদপুরে একটি স্পেশাল ইকোনোমিক জোন প্রতিষ্ঠা করার জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি। 

জেলা প্রশাসক বলেন, ফরিদপুর-মাদারীপুর সিমান্তে অলিম্পিক ভিলেজ নির্মিত হচ্ছে। সেতু সংলগ্ন এলাকায় শেখ হাসিনা তাঁত পল্লীর কাজ শুরু হয়েছে। ফরিদপুরের ভাঙ্গায় বঙ্গবন্ধু মহাকাশ পর্যবেক্ষন কেন্দ্রের কাজও শুরু হতে যাচ্ছে খুব দ্রুত। এসকল  প্রতিষ্ঠান স্থাপনের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দ্বার উন্মোচন হচ্ছে যার মধ্যে দিয়ে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগের সৃষ্টি হবে। এর মধ্যে দিয়ে মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাবে। পরিসংখ্যান থেকে জেনেছি, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর আমাদের জিডিপির হার আরো ১.৫ থেকে ২% বেড়ে যাবে যেটি সারা দেশের মানুষকে সমৃদ্ধ করবে। আমাদের যে লক্ষ্য রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত হওয়া এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত এবং সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশে পরিনত হওয়া, আমি মনে করি পদ্মা সেতু চালুর মধ্যে দিয়ে সেটি অর্জিত হওয়া অনেক বেশি তরান্বিত হবে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফরিদপুরের আর্থ সামাজিক অবস্থা আমূল বদলে দেবে এই পদ্মা সেতু। জেলার কৃষি অর্থনীতিতেও ঘটবে ইতিবাচক পরিবর্তন। বিশেষ করে ফরিদপুরের সালথা ও নগরকান্দা উপজেলার পেঁয়াজ চাষিরা লাভবান হবেন সরাসরি। এছাড়া সদরপুরের লালমি ও সবজি চাষীরা এবং মধুখালীর মরিচ চাষীরাও লাভবান হবেন।

সারা দেশের মধ্যে ফরিদপুর জেলা পেঁয়াজ উৎপাদনে রয়েছে প্রথম সারির দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে। আর জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে শুধু সালথা ও নগরকান্দা উপজেলাতেই যে পেঁয়াজ উৎপন্ন হয় তা বাকি ৭ উপজেলার সমান। 

দুই ধরনের পেঁয়াজ চাষ হয় ফরিদপুরে। বেশিরভাগই হালি পেঁয়াজ। আর কিছু চাষ হয় মুড়িকাটা জাতের। এই পেয়াজ একেবারেই সংরক্ষণ যোগ্য নয়। দ্রুত পচনশীল এই পেঁয়াজ গৃহস্থরা তাই কম দামে হাটে বাজারে বিক্রি করে দিতেন পঁচে যাওয়ার ভয়ে। অনেক সময় তাদের খরচের পয়সাও উঠতো না। হালি জাতের পেঁয়াজও বৃষ্টির পানি পেলে বা শুষ্ক স্থানে সংরক্ষণ করা না গেলে পঁচে নষ্ট হয়। ফলে যাদের সংরক্ষণের জায়গা নেই তারা বাধ্য হয়েই কম লাভে অথবা উৎপাদন মূল্যে মাঝারি ব্যবসায়ীদের কাছে পেঁয়াজ বিক্রি করে দিতেন। 

পেঁয়াজের মৌসুমে সালথা ও নগরকান্দা বিভিন্ন ইউনিয়নের হাট বাজার ছয়লাব থাকে পেঁয়াজে। কৃষাণ-কৃষাণী থেকে শুরু করে বর্গাচাষী এবং ছোট বড় পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সবাই এই দামি সবজি ফসল নিয়ে হয়ে পড়েন ব্যস্ত। তবে পচনশীল এই সবজিটি বাধ্য হয়েই অনেক সময় কম দামে বিক্রি করে দিতে হতো প্রান্তিক চাষীদের, যেটা আগামী মৌসুমে থেকে আর করতে হবে না। তাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু দিয়ে যানজট আর ভোগান্তি ছাড়াই রাজধানীসহ সংলগ্ন বিভিন্ন জেলাতে অনায়াসে পৌঁছে যেতে পারবে সালথা-নগরকান্দা তথা ফরিদপুর জেলার পেঁয়াজ। 

ফরিদপুর কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুর জেলায় বর্তমানে পোঁয়াজ চাষীর সংখ্যা ৩০ হাজারেরও বেশি। তাদের প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদন করতে বর্তমান বাজার মূল্য ৯’শ থেকে ১হাজার  টাকা খরচ হয়ে যায়।

ফরিদপুর জেলার সালথা উপজেলার বিভাগদী গ্রামের পেঁয়াজ ব্যাবসায়ী সাইফুল ইসলাম জানান, সেখান থেকে ট্রাকযোগে ঢাকার বাজারে পেঁয়াজ নিতে খরচ পরে কেজি প্রতি দেড়টাকা (১ টাকা ৫০ পয়সা) । ১০ টনের একটি ট্রাকে পেঁয়াজ বোঝাই করে ঢাকা পাঠাতে  বর্তমানে ব্যয় হয় ১৫হাজার  টাকার মতো । কিন্তু পদ্মা সেতু চালু হলে ১০ হাজার টাকায়  ট্রাক ভাড়া পাওয়া যাবে। ফলে দেড় টাকার জায়গায় খরচ নেমে আসবে এক টাকায়।  পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি বাঁচবে সময়। আগে ট্রাক ভাড়া নিয়ে তিন চার দিন আটকে থাকত ফেরিঘাটের জ্যামে, এখন প্রতিদিনই তারা ঢাকায় গিয়ে মাল নামিয়ে আবার ফিরে আসতে পারবে। ফলে পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা টাকা এবং সময় দুই দিক থেকেই লাভবান হবে। 

দেশের পাটের রাজধানী খ্যাত ফরিদপুরে ছোট বড় ২৩ টি পাটকল রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১০টি ভালোমত চালু রয়েছে। বাকীগুলো হয় বন্ধ রয়েছে, চালানো সম্ভব হচ্ছেনা উদ্যোক্তাদের পক্ষে। যেই জেলার ব্র্যান্ডিং স্লোগান ‘সোনালী আঁশে ভরপুর, ভালবাসি ফরিদপুর’ সেখানকার পাট ব্যাবসায়ীদের এই দুরাবস্থাও লাঘব করবে স্বপ্নের এই সেতু।

এই অঞ্চলের অন্যতম পাটশিল্প উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান করিম গ্রুপের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গির মিয়া জানান, আগে দৌলতদিয়া ফেরীঘাটে তিন থেকে চারদিন আমাদের পাট ও পাটজাত পণের চালান আটকে থাকতো। এর ফলে বিদেশী বায়ারদের কাছে সময়মত পাটপণ্য পৌছে দেয়ার চুক্তি বা শর্ত ভঙ্গ হতো হরহামেশাই যাতে কোটি কোটি টাকার লোকসান গুনতে হতো আমাদের। এখন ছোট মিলগুলোও নতুন করে বায়ার ধরতে পারবে, বন্ধ থাকা জুট ও স্পিনিং মিলগুলো আবার সচল হবে।  

ফরিদপুর চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির সভাপতি মো: নজরুল ইসলাম বলেন, শুধু পাট নয়, পাটের সাথে সম্পৃক্ত সুতা, পাটের ব্যাগ, চটসহ বিভিন্ন পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বিদেশে। শুধুমাত্র যাতায়াতের দীর্ঘসূত্রিতার কারনে এতদিন আমাদের জুটমিলগুলো মার খেয়েছে। পাটসহ বিভিন্ন কৃষি পন্য নিয়ে অবর্ননীয় দূর্ভোগের শিকার হতে হয়েছে আমাদের ব্যাবসায়ী মহলকে। সেতু চালু হওয়ার পর এই ভোগান্তি দূর হয়ে যাবে। পদ্মা সেতু ফরিদপুরের ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক বড় আশির্বাদ।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা থেকে বিভিন্ন পণ্য আনতে ফেরিঘাটের কারণে সময় লাগতো দুই তিন দিন। এখন দিনে দিনেই মালামাল চলে আসবে। অনেক সময় দেখা গেছে পন্য কিনেছি যে দামে, ফরিদপুরে আসতে সময় লাগায় তার দর পড়ে গেছে, ফলে ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হতো। এখন আর সেই ক্ষতির আশংকা থাকবেনা তাদের।

চেম্বার সভাপতি বলেন, একাধিক শিল্পপতি ও তাদের প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই বৃহত্তর ফরিদপুরের বিভিন্ন জায়গা কিনেছেন শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য। অনেকে জায়গা ভরাটের কাজ শুরু করেছেন, আবার অনেকে অবকাঠামো নির্মাণের কাজও শুরু করে দিয়েছেন। পদ্মা সেতু এ অঞ্চলের মানুষের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের পথ খুলে দিয়েছে। 

ফরিদপুর পৌরসভার মেয়র অমিতাভ বোসের মতে, ফরিদপুরের যে কৃষক তাদের উতপাদিত পণ্য ঢাকায় সময় মত নিয়ে যেতে পারতোনা, সেতটিু চালু হওয়ার পর তারা সরাসরি পণ্য ঢাকায় নিয়ে রাজধানী ও তার আশেপাশের অঞ্চলের বাজারে যেতে পারবেন। আগের চেয়ে অনেক কম সময়ে ঢাকায় যেতে পারবেন এই অঞ্চলের বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ। সময় বেঁচে যাওয়ার অধিক কর্মঘণ্টা কাজ করার সুযোগ পাওয়ায় তারা আর্থিক ভাবেও লাভবান হবেন। 

তিনি বলেন, বাঙালীর জাতীয় জীবনে যে সকল বড় বড় অর্জন রয়েছে পদ্মা সেতু তার মধ্যে  অন্যতম অর্জন। আর এটি সম্ভব হয়েছে আমাদের  প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বের কারনে । 

ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি কবিরুল ইসলাম সিদ্দিকী মনে করেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়া মানেই এঅঞ্চলের মানুষের অর্থনীতির চাকা দ্রুত সামনের দিকে ঘুরতে শুরু করা। ফরিদপুর অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। প্রধানমন্ত্রী আমাদের এই ব্যাথা, কষ্টকে মর্মে মর্মে উপলব্দি করে নানা ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে এই সেতু নির্মাণ করেছেন। উন্নয়নের যে মহাযজ্ঞ তিনি দেখিয়েছেন পৃথিবীর ইতিহাসে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।