বন্যায় পুরো বাড়িঘর তছনছ হয়ে গেছে সিলেট সদর উপজেলার পুঁটিকাটা গ্রামের নাসির উদ্দিনের। এখন তিনি কর্মহীন। ঘর মেরামতের জন্য হাতে কোনো টাকা নেই। একই অবস্থা তাঁর প্রতিবেশী মো. সহিন, রমুজ মিয়া, মমিনা বেগমদের। বন্যার পানি কমায় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরলেও তাঁরা তাই কার্যত আশ্রয়হীন।

সরকারি ত্রাণ না পেলেও বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শুকনো খাবারে কোনোমতে বেঁচে আছেন তাঁরা। কোনোদিন রান্না করা খাবারও মিলছে। কিন্তু অর্থাভাবে বাড়িঘর মেরামত করতে পারছেন না শ্রমজীবী মানুষগুলো। নগরী থেকে ১০-১৫ কিলোমিটার দূরে হাওর-নদীতীরের গ্রামগুলোর মানুষ লড়াই করেই টিকে আছেন। এবার ভয়াবহ বিধ্বংসী বন্যা তাঁদের অসহায় করেছে।

সফুরা বেগমের স্বামী রাজধানীতে রিকশা চালান। সদর উপজেলার কান্দিগাঁওয়ের বাড়িতে চার সন্তান নিয়ে থাকেন তিনি। ছোট বাচ্চা নিয়ে চার দিন ঘরে আটকে থাকার কথা বলছিলেন এভাবে- 'ঘরে গলাপানি, নৌকা নাই। খালি কান্দিছি। পরে মাইনষে নৌকা লইয়া আইয়া বাইর করছইন।' এক সপ্তাহের মতো বাড়ির পাশে উঁচু রাস্তায় ত্রিপলের নিচে শতাধিক মানুষের সঙ্গে ছিলেন সফুরা।

নদনদীর পানি কমায় সিলেটে প্লাবিত এলাকার বাড়িঘর ও রাস্তাঘাট থেকে পানি ধীরে ধীরে নামছে। ফলে হাজারো মানুষ ঘরে ফিরছেন। তাঁরা ফিরে দেখছেন, ভারি বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও হাওরের ঝোড়ো বাতাসে অনেকের ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। সরকারি সহযোগিতা না পেলে ঘরবাড়ি ঠিক করার কোনো উপায় নেই তাঁদের।

চেঙ্গেরখালের তীরে ভূসিমালের দোকানি সাদ্দামের দোকানের প্রায় সব গেছে বানের পানিতে। এখনও তাঁর ঘরে পানি। দোকানও খুলতে পারছেন না। সংসার চলবে কীভাবে, সেই চিন্তায় আছেন। আশপাশের মানুষের যে অবস্থা, দোকান খুললেও ব্যবসা করা দায়।

এই অসহায় মানুষগুলো কবে সরকারের আর্থিক সহযোগিতা পাবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। গত মাসের মাঝামাঝি সিলেটে ভয়াবহ বন্যায় সরকারি হিসাবেই ৮৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। সেই সময়ে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা হলেও কেউ ক্ষতিপূরণ পাননি। এবারের বন্যার ভয়াবহতা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ফলে ক্ষয়ক্ষতিও বেশি হবে। গতকাল পর্যন্ত সরকারি হিসাবে জেলায় বন্যায় ৩ লাখ ৮৯ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তত ২২ হাজার ঘরবাড়ি এবং প্রায় ২৯ হাজার হেক্টর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম বলেন, অতীতে বন্যা বা যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় অগ্রিম বরাদ্দ হতো। এখন 'ড্যামেজ অ্যান্ড নিড অ্যাসেসমেন্ট' কর্মসূচির আওতায় ২৭ খাতে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করার পর ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা অনুযায়ী মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়। এখনও তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়নি। মে মাসের মাঝামাঝি সিলেটে ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা পাঠানো হলেও সেই বরাদ্দ এখনও আসেনি।

সিলেটে বন্যায় গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সদর উপজেলা। এই উপজেলার বাদাঘাট-বাইশটিলা সড়কের এক পাশে চেঙ্গেরখাল; আরেক পাশে ছোট ছোট হাওর। এই সড়কের বিভিন্ন জায়গা এখনও তলিয়ে থাকলেও উঁচু জায়গাগুলো থেকে পানি নেমেছে। এই সুযোগে শত মানুষ পানিতে ভিজে নষ্ট ধান-চাল শুকাতে দিয়েছেন। কয়েক কিলোমিটার রাস্তায় বিরতি দিয়ে লোকজন ধান-চাল ও খড় শুকাতে দিয়েছেন। বন্যায় পচে যাওয়া ধান-চালের দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। চামাউরাকান্দি গ্রামের সোহরাব মিয়া বলেন, বন্যায় ৩০-৩৫ মণ ধান-চাল ভিজে নষ্ট হয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বন্যার্ত ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ বাড়িঘরে ফিরেছেন বলে জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে। তবে এখনও ৭১ হাজারের বেশি বানভাসি মানুষ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।

সিলেটে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করা যাচ্ছে না বলে সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন। সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লুসিকান্ত হাজং বলেন, 'পানি এক দিনে এক সেন্টিমিটারও কমছে না। পানি দ্রুত না কমায় বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। তাঁদের পুনর্বাসনেও উদ্যোগ নেওয়া যাচ্ছে না।'