'তখন ব্রিজটা থাকলে আমার কোল খালি অইত না, আমি পোলাডারে হারাইতাম না। স্বজনহারা হইতাম না। এখন ব্রিজ অওয়াতে (হওয়ায়) ভালোও লাগছে, গাঙে আর কোনো মায়ের বুক খালি অইব না।' মাদারীপুরের শিবচরের গোয়ালকান্দার বাড়িতে বসে কথাগুলো বলছিলেন রিজিয়া বেগম। হারানো স্বজনের স্মৃতি হাতড়ে তখনও তাঁর চোখে অশ্রু। তা মুছেই বলছিলেন, 'বাড়ির কাছেই এখন সেই পদ্মায় সেতু হইছে।'

২০১৪ সালের ৪ আগস্ট প্রমত্ত পদ্মায় পিনাক-৬ লঞ্চডুবিতে আরও ৪৯ জনের সঙ্গে রিজিয়া বেগমের ছেলে মিজানুর রহমান, পুত্রবধূ মিলি আক্তার ও এই দম্পতির শিশু ছেলে-মেয়ে মারা যান। এরপর তিনি ওই নদীতে আর লঞ্চে ওঠেননি। পদ্মা তাঁর কাছে আতঙ্কের নাম। এখন সেখানে সেতু হওয়ায় খুশি তিনি।

এর দুই বছর আগে ১৩ মার্চ রাতে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় এমভি শরীয়তপুর-২ নামের যাত্রীবাহী লঞ্চডুবিতে প্রাণ হারান দেড় শতাধিক যাত্রী। ওই লঞ্চেই ছিলেন নববধূ শান্তা আক্তার, তার স্বামীসহ অন্তত ছয়জন স্বজন। অন্য যাত্রীদের সঙ্গে প্রাণ হারান তাঁরাও।

শান্তার বাবা মতি কাহেত বলছিলেন, তাঁর কোনো মেয়ে ছিল না। ছোটবেলা থেকেই দত্তক নিয়ে মেয়েটাকে লালন-পালন করে ২০১২ সালে বিয়ে দিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান শেষ করে মেয়ে ও জামাতার পক্ষের লোকজন ঢাকার বাসায় ফিরছিলেন ওই লঞ্চে। সেটি ডুবে প্রাণ হারান মেয়েসহ জামাতা পক্ষের কয়েক স্বজন। আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, তখন ব্রিজটা থাকলে রাতের লঞ্চে মেয়েকে তুলে দিতেন না। এভাবে মেয়েটাকেও হারাতে হতো না। এখন পদ্মার বুকে সেতু হয়েছে। দক্ষিণ পাড়ের লোকজন নিরাপদে ঢাকায় যাতায়াত করতে পারবেন।

শুধু রিজিয়া বেগম বা মতি কাহেতই নন, সেতু না থাকায় তাঁদের মতো দক্ষিণাঞ্চলের অনেক পরিবার নৌপথে যাতায়াত করতে গিয়ে স্বজনহারা হয়েছেন। কারও কারও সলিল সমাধি হয়েছে। কিন্তু পদ্মা সেতুর কারণে নদীর দুই তীরের স্থলপথ জোড়া লাগায়, যাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চে চলাচল করতে বাধ্য হতেন, তাঁরা এখন খুশি।

ওই দুটি লঞ্চ দুর্ঘটনা ছাড়াও গত ২২ বছরে দক্ষিণাঞ্চল থেকে ছেড়ে আসা বা দক্ষিণাঞ্চলের উদ্দেশে ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যাওয়া অন্তত ছয়টি লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটেছে। এতে দেড় হাজারের বেশি মানুষ ডুবে নিহত হয়েছেন। সলিল সমাধি হয়েছে অনেকের।

পুরোনো ফাইল ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০০০ সালের ২৯ ডিসেম্বর চাঁদপুরের মতলবে এমভি রাজহংসী লঞ্চডুবিতে ১৬২ জন যাত্রী প্রাণ হারান, ২০০২ সালের ৩ মে রাতে চাঁদপুরের ষাটনল এলাকায় এমভি সালাউদ্দিন-২ লঞ্চ ডুবে সাড়ে চারশ যাত্রী নিহত হন। অবশ্য ২০০৩ সালের ৮ জুলাই ভোলাগামী এমভি নাসরিন-১ লঞ্চডুবির ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ৬৫০ জন যাত্রী প্রাণ হারান। ২০১২ সালের ১৩ মার্চ একই রুটে শরীয়তপুর-২ লঞ্চ ডুবে ১৫০ জনের বেশি যাত্রী প্রাণ হারান। ২০১৪ সালের ১৫ মে গজারিয়ায় এমভি মিরাজ-৪ লঞ্চ ডুবে ৬০ যাত্রী মারা যান। একই বছরের ৪ আগস্ট পদ্মার মাওয়া পয়েন্টে পিনাক-৬ ডুবিতে ৪৯ জন নিহত হন, অন্তত ৫০ যাত্রীর কোনো সন্ধানই মেলেনি। এ ছাড়া গত বছরের ৪ মে পদ্মার বাংলাবাজার ঘাটের অদূরে স্পিডবোটডুবির ঘটনায় ২৬ যাত্রী নিহত হন। যদিও ওই রুটে মাঝেমধ্যেই স্পিডবোট ও ট্রলারডুবিতে প্রাণহানি ঘটে। নিহত ও সলিল সমাধি হওয়া যাত্রীর প্রায় সবার বাড়ি বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, ভোলা, পিরোজপুর, বরগুনা, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ জেলায়।

পিনাক-৬ লঞ্চের যাত্রী ছিলেন রাজধানীর শিকদার মেডিকেল কলেজের ছাত্রী নুসরাত জাহান হীরা, তাঁর বোন রাইফেলস পাবলিক কলেজের ছাত্রী ফাতেমা তুজ জোহরা স্বর্ণা এবং তাঁদের খালাতো বোন চীনের জইনজু ইউনিভার্সিটির এমবিএ ছাত্রী জান্নাতুন নাঈম লাকি। হীরা-স্বর্ণার লাশ মিললেও শেষ পর্যন্ত লাকির লাশ পাওয়া যায়নি। ওই পরিবারের একজন স্বজন বলেন, পদ্মায় সেতু হওয়ার কারণে এভাবে আর কাউকে মরতে হবে না। এখন সেতু হওয়ায় পদ্মাপাড়ের মানুষের যাতায়াত নিরাপদ হয়েছে।