স্বপ্ন নয়, সত্যি। সত্যিই আজ বাঙালির গর্বের দিন। বাঙালি বিশ্বের বুকে অন্যতম পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অদম্য সাহসিকতা ও অসম্ভব রকমের দৃঢ়তার কারণেই কোটি মানুষের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তাঁর বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত, আত্মবিশ্বাস ও দেশপ্রেমেই জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, বাধা-বিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতার ধাপ ডিঙিয়ে যাত্রা শুরু করছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত দেশের দীর্ঘতম পদ্মা সেতু।

অথচ বিশ্বব্যাংকের বাগড়ার কারণে সেতুটির নির্মাণকাজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সেতু নির্মাণে ১২০ কোটি ডলার ঋণ দিতে চেয়েছিল বিশ্বব্যাংক। কিন্তু কথিত দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ এনে (পরবর্তী সময়ে কানাডার আদালতে দুর্নীতির অভিযোগের কোনো প্রমাণ না হওয়ায় বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ খারিজ হয়ে যায়) তারা ঋণ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। ফলে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে পদ্মা সেতুর নির্মাণ। তারপরও সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ওই সময় অর্থাৎ ২০১১ সালের ১৭ অক্টোবর ছাত্রদলের এক অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পদ্মার বুকে সেতু নির্মাণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, 'পদ্মা সেতুর স্বপ্ন দেখাচ্ছে সরকার। কিন্তু পদ্মা সেতু আওয়ামী লীগ আমলে হবে না। এই সেতু জোড়াতালি দিয়ে বানানো হচ্ছে। এই সেতুতে কেউ উঠবেন না। অনেক রিস্ক আছে।' এ কথা সত্য হয়নি।

২০১২ সালের ৯ জুলাই ৩০ হাজার ১৯৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকার নিজস্ব অর্থায়নে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার লম্বা দ্বিতল পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, 'কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। বাঙালি কখনোই কারও কাছে মাথানত করে না। আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দিতে চাই, কারও সাহায্য ছাড়াই বাংলাদেশ বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে সক্ষম।'

এভাবেই এগিয়ে চলল পদ্মা জয়ের আখ্যান। ২০০১ সালের ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তাঁর নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও জাতির মর্যাদা সমুন্নত রাখার অমিত সাহসের ফলে সেতু নির্মাণের প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, পরামর্শক ও নির্মাণকর্মীরা উজ্জীবিত হন। তাঁদের অহর্নিশ কঠোর পরিশ্রম আর কর্মযজ্ঞে গড়ে ওঠে স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে বৃহত্তম অবকাঠামো পদ্মা সেতু।

এ ক্ষেত্রে ভাবতে হয়েছে প্রকৃতির কথা, পদ্মার ইলিশকে ভুলে তো সেতু করা যাবে না। চলতে হবে জাহাজও। লাগবে সংযোগ সড়ক। রেলসংযোগ আর অপরিহার্য নদীশাসন। এসব করেই পদ্মার দুই তীর যুক্ত হয়েছে। মাত্র সাত মিনিটে পদ্মা পেরিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে গোটা দেশ।

রাজনৈতিক বিশ্নেষকদের দৃষ্টিতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অসীম দৃঢ়তা ও অদম্য সাহসিকতার কারণেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, বিদেশনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে নিজেদের টাকায় বাংলাদেশ যে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করতে সক্ষম।

কয়েকজন দুস্কৃতকারীর ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে এবং নানা বাধা ডিঙিয়ে সেতু নির্মাণকাজ বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এটাই শেখ হাসিনা। তিনি গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছেন, জনগণের কল্যাণে তিনি যা কিছু বলেন, সেটাই বাস্তবায়ন করেন। তা ছাড়া নিজের নামে সেতুর নামকরণের প্রস্তাব বাতিল করেও অনেক বড় উদারতা দেখিয়েছেন শেখ হাসিনা।

পদ্মা সেতুর সঙ্গে দেশের প্রত্যেক মানুষের অনুভূতি জড়িয়ে আছে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, পদ্মা সেতু এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। পদ্মা সেতু শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি এখন বাঙালি জাতি তথা বাংলাদেশের গর্ব, আত্মমর্যাদা ও অহংকারের প্রতীক।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নির্মাণের পর সংসদে বলেছেন, 'নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূস একটি এমডি পদের লোভে বিশ্বব্যাংককে দিয়ে, হিলারি ক্লিনটনকে দিয়ে পদ্মা সেতুর টাকা বন্ধ করিয়েছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, আমরা আত্মসমর্পণ করব। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমি শেখ মুজিবের মেয়ে। কখনও অন্যায়ের কাছে মাথানত করিনি, কখনও করবও না।'