প্রমত্তা পদ্মার বুকে বাঙালির গর্ব ও অহঙ্কারের প্রতীক পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আর কিছু মুহূর্ত কেবল বাকি; প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ শনিবার উদ্বোধন করবেন দেশের সবচেয়ে বড় এ যোগাযোগ অবকাঠামোর।

রোববার পদ্মা সেতু খুলে দেওয়া হবে চলাচলের জন্য। পদ্মার দুই তীরের পাশাপাশি সারা দেশে তাই উৎসবের সাজ।

মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে সেতুর মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান যেখানে হবে, ইতোমধ্যে সেই সুধী সমাবেশ স্থলে পৌঁছে গেছেন সরকারের মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের অধিকাংশই।

প্রায় সাড়ে তিন হাজার অতিথিকে মাওয়া প্রান্তে সুধী সমাবেশের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। হেলিকপ্টারে করে মাওয়ায় পৌঁছে সকাল ১০টায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী।  

সেতুর টোল প্লাজার কিছুটা আগে এক পাশে অস্থায়ী প্যান্ডেল করে অতিথিদের বসার ব্যবস্থা হয়েছে। মঞ্চে রয়েছে চারটি চেয়ার। দুই পাশে দুটো ডায়াস আর তার দুটো জায়ান্ট স্ক্রিন।

সেতুর উদ্বোধন ঘোষণার পর মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী ফলক ও ম্যুরাল-১ উন্মোচন করবেন সরকারপ্রধান। তারপর টোল দিয়ে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু দিয়ে পদ্মা পার হয়ে যাবেন শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে।

সেখানে তিনি পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী ফলক ও ম্যুরাল-২ উন্মোচন করবেন। দুটো ভলবো বাসে করে ঢাকা থেকে আসা সরকারের মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারাও প্রধানমন্ত্রীর বহরের সঙ্গে পদ্মা সেতু পার হবেন।

এরপর পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে মাদারীপুরের বাংলাবাজারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভা যোগ দেবেন শেখ হাসিনা। যেখানে ১০ লাখ লোক জমায়েতের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলা ছাড়াও মুন্সিগঞ্জ, ঢাকা ও অন্যান্য জেলা থেকেও বাস, আর লঞ্চে করে মানুষ সেখানে আসছে সকাল থেকে।

পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, এই পদ্মা সেতু বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রতীক। দেশে রাজনৈতিক মুক্তি অর্জিত হলেও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য আমরা কাজ করছি। আমি মনে করি, অর্থনৈতিক মুক্তির পথে এ পদ্মা সেতু অবদান রাখবে। 

প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, পদ্মা সেতু চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষিক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগ আসবে।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, আজকে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উৎসব সকলের। আমরা সার্বজনীন এ উৎসবের অংশবিশেষ হতে পেরে গর্বিত।

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী বলেন, সত্যিই আজকে একটা বড় দিন। এই বড় দিনটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, দক্ষিণ এশিয় অঞ্চলের জন্যই এই দিনটি গর্বের। বাংলাদেশ নিজের অর্থায়নে এই পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছে, এটা সত্যিই আনন্দের দিন। 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইলি বলেন, পদ্মা সেতুর উদ্বোধন দেখতে সত্যিই উত্তেজিত হয়ে আছি। বাংলাদেশের মানুষের যোগাযোগের এক নতুন দুয়ার উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। অভিনন্দন বাংলাদেশ।

২ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ পদ্মা সেতুর সুফলভোগী হবেন। তবে বাস্তবতা বলছে, দক্ষিণবঙ্গের প্রায় চার কোটি মানুষের জীবনকে সহজ করবে পদ্মা সেতু। 

ইতিহাসের প্রথমবার দেশের রাজধানীর সঙ্গে সরল পথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এতে খুলবে অমিত সম্ভাবনার দুয়ার। দক্ষিণবঙ্গে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, পর্যটন সর্বক্ষেত্রের উন্নতিতে ভূমিকা রাখতে পদ্মা সেতু।

সমীক্ষা অনুযায়ী, ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বাড়াবে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ। তবে দক্ষিণাঞ্চলের জিডিপি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। 

১৯৯৮ সালে পদ্মা সেতুর পরিকল্পনা হলেও দুই বছরের প্রাক-সমীক্ষা শেষে ২০০১ সালের ৪ জুলাই এই সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন শেখ হাসিনা। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের দীর্ঘতম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় দীর্ঘতম সেতু। এই সেতুর গভীরতম পাইল ১২৫ দশমিক ৪৫ মিটার, যা এক বিশ্বরেকর্ড। 

২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারের ওপর প্রথম স্প্যান স্থাপন করা হয়। ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর ১২ ও ১৩ নম্বর পিলারের ওপর শেষ স্প্যান বসে। যুক্ত হয় পদ্মা নদীর দুই পাড়।