সুনামগঞ্জের জয়কলস ইউনিয়নের সদরপুর গ্রামের ৭০ বছর বয়সী খরফুল নেসা কাঁদতে কাঁদতে চোখের নিচে কালি ফেলেছেন। তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বন্যায় মৃত ছেলের একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি নিয়ে বসে বসে কাঁদছেন। তাঁর কান্না থামানোর যেন কেউ নেই। পাশেই বসে আছেন পুত্রবধূ শাবানা। স্বামীকে হারিয়ে তিনিও বাকরুদ্ধ।
চোখের পানি মুছতে মুছতে খরফুল নেসা বললেন, 'বানের পানি আমার সোনা মানিকরে মাইরা ফালাইছে।' তাঁর কথা শুনে চোখ ভিজে যায় অকালে বিধবা হওয়া শাবানারও। তাঁর স্বামী গয়েজ মিয়া (৩২) এবং বোন লুবনা বেগম (১৭) পানিতে ডুবে মারা যান। চার দিন পর তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
গত কয়েক দিনে সিলেট অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখন পর্যন্ত ডুবে আছে বিস্তীর্ণ অঞ্চল। সুনামগঞ্জ জেলায় ভয়াবহ বন্যায় এখন পর্যন্ত কত জনের মৃত্যু হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। জেলার বিভিন্ন জায়গায় পানিতে ডুবে মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে।
খরফুল নেসা এ প্রতিবেদককে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। বয়সের কারণে তিনি কানে শুনতে পারেন না। কান্নারত অবস্থায় ছেলের ছবি হাতে নিয়ে চুমু খেতে খেতে বললেন, 'আল্লাহ আমারে নিয়া গয়েজের হায়াত বাড়ায় দিত।'
এবার বন্যা শুরুর পরদিন গত ১৭ জুন সদরপুর নিজ বাড়ি থেকে আশ্রয়কেন্দ্র যাওয়ার পথে নৌকা ডুবে প্রাণ হারান গয়েজ এবং তাঁর শ্যালিকা লুবনা। গয়াজের স্ত্রী শাবানা সমকালকে বলেন, 'সেদিন বিকেল ৩টার দিকে হঠাৎ আমাদের বাড়িতে বুকসমান পানি ওঠে, সবকিছু ডুবে যায়। কোনোমতে প্রাণ বাঁচানোর জন্য আমি, আমার ছোট বোন এবং আমার স্বামী এক নৌকায় উঠি। নৌকা কিছুদূর যাওয়ার পর প্রবল স্রোতের কারণে সেটি ডুবে যায়। এরপর আমার জ্ঞান হারায়। এরপর কী ঘটেছে, আমি কিছু বলতে পারব না। জ্ঞান ফেরার পর শুনি আমার স্বামী আর আমার ছোট বোন মারা গেছে।' বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন শাবানা।
এই ঘটনা কাছ থেকে দেখেছেন গয়েজের চাচাতো ভাই আক্তার হোসেন। তিনি সমকালকে বলেন, দুর্ঘটনার সময় মোট ছয়জন নৌকায় ছিলেন। নৌকা ডুবে যাওয়ার পর তিনজন সাঁতরে বাঁচতে পারলেও গয়েজ, তাঁর স্ত্রী এবং শ্যালিকা ডুবে যান। অনেক খোঁজাখুঁজি শেষে প্রায় তিন ঘণ্টা পর পাশের নাগডোরা এলাকায় শাবানাকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। তারপর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও গয়েজ আর লুবনাকে পাওয়া যায়নি। গত সোমবার বরমুখা হাওর অঞ্চল থেকে গয়েজ আর লুবনার লাশ উদ্ধার করা হয়। তিন ভাইয়ের মধ্যে গয়েজ সবার ছোট।
গয়েজ-শাবানার প্রায় ১০ বছরের সংসার। সংসারে কোনো সন্তানাদিও নেই। শাবানা বলেন, 'আমার তো কোনো সন্তানও নেই। গয়েজও নাই, ছোটবোন লুবনাও নেই। এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব?' এ কথা বলে প্রতিবেদকের সামনেই বারবার মূর্ছা যান তিনি।
গয়েজের বাড়িতে এখন শোকের মাতম। এলাকাবাসী বলছেন, এখন পর্যন্ত তাঁদের বাড়িতে সরকারি ত্রাণ তো দূরের কথা, কেউ দেখতেও আসেননি। আক্তার হোসেন বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এ পরিবারের কেউ খোঁজ নেয়নি। কেবল ঢাকা থেকে এই অঞ্চলে ত্রাণ বিতরণ করতে আসা তারেক রহমান নামের এক যুবনেতা কিছু অর্থ সহযোগিতা করেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কেউ আসেননি।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন সমকালকে বলেন, সুনামগঞ্জের সব উপজেলায় পানিতে ডুবে মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। মৃতদের পরবর্তী সময়ে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।