দীর্ঘ ১১ দিন পরও সিলেট নগরীর অনেক স্থানে বন্যার পানি নিশ্চল হয়ে আছে। নগরী-সংলগ্ন পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে নেমেছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানি কমলেও অনেক এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। কানাইঘাট পয়েন্টে সুরমার পানি এখনও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় কুশিয়ারা নদীর পানি কার্যত অপরিবর্তিত থাকায় সিলেটে প্রলম্বিত বন্যায় মানুষের দুর্ভোগ কমছে না।

দক্ষিণ সুরমার রাখালগঞ্জের বাসিন্দা হোসেন আলী বলেন, 'পানি কয়েক দিন ধরে থমকে আছে। বাড়ছেও না, নামছেও না। ৭-৮ দিন ধরে ঘরে পানি। এভাবে কত দিন থাকা যায়?'

ওসমানীনগরের ওমরপুর ইউনিয়নের হাসতনপুর গ্রামের আনফর মিয়া বলেন, এখনও ঘরে হাঁটুপানি। অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে তাঁর পরিবার। এখন যেভাবে পানি কমছে, তাতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও এক সপ্তাহ লাগবে। নতুন করে বৃষ্টিপাতও শুরু হয়েছে। তাই পানি বাড়ারও ভয় আছে।

তবে সিলেটে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসিফ আহমেদ বলেন, সিলেটে বৃষ্টি না হওয়ায় পানি কমতে শুরু করেছে। পানি ধীরগতিতে নামছে। আর বৃষ্টি না হলে আগামী দু-এক দিনের মধ্যে পানি আরও কমে যাবে।

সকালে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উপশহর, তালতলা সড়কসহ বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার সড়কগুলোতে পানি রয়ে গেছে। তবে কয়েক দিন ধরে ওই সড়কগুলোতে নৌকা চলাচল করলেও এখন সাধারণ যানবাহন চলাচল করছে। নগরীর যতরপুর, মিরাবাজার, উপশহরের একাংশ, সোবহানীঘাট, মির্জাজাঙ্গাল, তালতলা, জামতলা, শেখঘাট, ঘাসিটুলা, কুয়ারপার, লালাদিঘীরপার, ছড়ারপার, মাছিমপুর এলাকার পাড়া-মহল্লার পানি ময়লা-আবর্জনায় কালো রং ধারণ করেছে। এসব এলাকায় বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি থেকে উৎকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

সরকারি হিসাবে নগরীর আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ৭ হাজার ৫০৭ জন এখনও রয়েছেন। পুরো জেলায় সব মিলে ৬০৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৫৯ হাজার ৬৯৯ জন বন্যার্ত মানুষ রয়েছেন। এ ছাড়া ৪ হাজার ৩৮৮টি গবাদি পশু রয়েছে এখানে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১২ হাজারের মতো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরেছেন। তবে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়িতে ফেরা মানুষের জীবনে নতুন যুদ্ধ শুরু হয়েছে। জৈন্তাপুর উপজেলার শুকইনপুর গ্রামের বাসিন্দা খলিল আহমদ বলেন, তাঁর বাড়িঘর, আসবাব, এক বস্তা চাল, ধান, শিশুর পড়াশোনার জন্য বই-খাতা সব পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন মা-বাবা, স্ত্রী, সন্তানসহ ১১ সদস্যের পরিবার কীভাবে চলবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি। একই উপজেলার ভাটপাড়া গ্রামের আব্বাস উদ্দিন বলেন, ঘরের সব নষ্ট হয়েছে। সবচেয়ে বিপদে আছি গরু-ছাগল নিয়ে। বাড়ির পাশে রাস্তায় এখনও হাঁটুসমান পানি।

ত্রাণ বিতরণে হচ্ছে সমন্বয় কমিটি: সিলেটে ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়ের অভাবে অনেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সিলেটে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক রজত কান্তি গুপ্ত বলেন, 'মানুষ মহৎ উদ্দেশ্যে ত্রাণ নিয়ে আসছেন। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার অভাবে এই ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে। এ জন্য সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।'

বেসরকারিভাবে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বিপুল পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী এলেও তা বিতরণে সমন্বয়হীনতার কথা স্বীকার করে সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) দেবজিৎ সিংহ জানান, ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য প্রত্যেক উপজেলায় আলাদা সমন্বয় কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে শনিবারের (গতকাল) মধ্যে এই কমিটি করার জন্য সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে। সংশ্নিষ্ট জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসন উপজেলা পর্যায়ে সমন্বয় কমিটির কাজ তদারকি করবে।

পদ্মা সেতুর খুশিতে শামিল সিলেটও: নিজেদের দুর্দিন সত্ত্বেও পদ্মা সেতু নিয়ে গর্বিত সিলেটবাসী। জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের উদ্যোগে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বড় পর্দায় সম্প্রচার করা হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ তা উপভোগও করেছেন। মহানগর ও জেলা পুলিশ শোভাযাত্রা বের করে। জেলা প্রশাসক মজিবর রহমান বলেন, 'সীমিত পরিসরে আমরা পদ্মা সেতুর উৎসবে শামিল হয়েছি। নগরীর উপশহরের বন্যার্ত হাসিবুল হোসেন বলেন, বন্যায় সিলেটের মানুষ কষ্ট আছেন। তার পরও দক্ষিণের মানুষের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনে আমরা খুশি।'