পদ্মা সেতুর দুই পাড়ের বিস্তৃত এলাকায় জমির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। বসতবাড়ি, বাণিজ্যিক, শিল্পায়নসহ নানা কাজের জন্য জমি এখন হাতের নাগালের বাইরে। কোথাও কোথাও জমির দাম সোনার চেয়েও বেশি। এ মহূর্তে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সেতুর মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের বিশাল এলাকায় জমির দাম বেড়েছে ৮ থেকে ১০ গুণ। সংশ্নিষ্ট একাধিক সূত্র এই তথ্য জানিয়েছে।

জানা যায়, সেতুর দুই পাড়ের বিভিন্ন উপজেলা ও জেলার জমির মালিকদের কেউই জমি বিক্রি করছেন না। তাঁরা মনে করছেন- জমির দাম আরও বাড়বে। ভবিষ্যতে আরও বাড়তি দামে জমি বিক্রি করবেন অথবা অনেকে নিজেদের জমিতে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করবেন। সেতুর জমি অধিগ্রহণের সময় বড় বড় ব্যবসায়ীরা মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর, সিরাজদীখান, লৌহজং, টঙ্গিবাড়ী এলাকায় ব্যাপকহারে ফসলি জমি কেনেন। এতে ভবিষ্যতে ওইসব এলাকায় ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরেজমিন পরিদর্শনকালে আরও জানা যায়, এখন সেতুর দুই পাড়ে জমি আছে ঠিকই কিন্তু এই মুহূর্তে বিক্রির মতো কোনো জমি নেই। সবাই জমি ধরে রাখছেন আরও দাম হবে, উন্নয়ন হবে এই আশায়।

আইন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, সেতুর দুই পাড়ের জমির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় আগের নির্ধারিত মৌজা মূল্যের সঙ্গে বর্তমান বাজার মূল্যের পার্থক্য অস্বাভাবিক। তাই বাজার মূল্যের সঙ্গে সংগতি রেখে শিগগির দুই পাড়ের জমির মৌজা মূল্য নির্ধারণ করা হবে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান পিএএ সমকালকে বলেন, জমি অধিগ্রহণের সময় সেতুর দুই পাড়ের যারা বসতভিটা হারিয়েছেন তাঁদের পুনর্বাসনের আওতায় আনা হয়েছে। আর যারা ধানি জমি হারিয়েছেন তাঁদের জমির ওই সময়ের মৌজামূল্যের তিনগুণ দাম দেওয়া হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু জানান, মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডল এলাকার মো. আক্কাস আলী সমকালকে বলেন, তাঁর এলাকায় ৮-১০ বছর আগে প্রতি শতাংশ জমি ১ লাখ টাকায় বেচাকেনা হতো। এখন প্রতি শতাংশের দাম ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা। জাজিরা পৌরসভার মেয়র মো. ইদ্রিস মাতবর বলেন, তাঁর এলাকায় আগে যে জমির দাম ছিল এক থেকে দেড় লাখ টাকা কড়া (দুই শতাংশ), তা এখন বেড়ে ১২ লাখ টাকা হয়েছে। নদীশাসন বাঁধের কারণে জমির নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়ায় জমির প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেড়েছে। তাই দামও আকাশচুম্বী।

মাওয়া-লৌহজং প্রতিনিধি মিজানুর রহমান ঝিলু জানান, সেতুর উত্তর প্রান্তে সেতুসংলগ্ন দুই পাশের মেদেনীমণ্ডল ও কুমারভোগ ইউনিয়নে জমি অধিগ্রহণের সময় থেকে ৮-১০ বছর আগে এখানে প্রতি শতাংশ জমির মূল্য ছিল ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা। বর্তমানে এসব এলাকায় প্রতি শতাংশ জমির মূল্য ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর, সিরাজদীখান, লৌহজং, টঙ্গিবাড়ী এলাকায় এক টুকরো জমি কেনার জন্য মানুষ ঘুরেও পাচ্ছে না।

শিবচর প্রতিনিধি মোহাম্মদ আলী মৃধা জানান, সেতুসংলগ্ন বোয়ালকান্দা এলাকায় আট বছর আগে প্রতি শতাংশ জমির মূল্য ছিল ২ থেকে ৩ লাখ টাকা। বর্তমানে এখানে প্রতি শতাংশের মূল্য ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা।

শরীয়তপুর প্রতিনিধি শহিদুল ইসলাম পাইলট জানান, সেতুর দক্ষিণ প্রান্তের জাজিরা উপজেলায় সেতুসংলগ্ন পূর্ব ও পশ্চিম নাওডোবা ইউনিয়নে ৮-৯ বছর আগে প্রতি শতাংশ জমির মূল্য ছিল দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। বর্তমানে এসব এলাকায় এখন এক শতাংশ জমির মূল্য ৭-৮ লাখ টাকা। তিনি আরও জানান, জমির দাম আরও বাড়বে- এই আশায় এলাকার মানুষ তাঁদের জমি বিক্রি করছেন না। ৮-৯ বছর আগে সেতুর জমি অধিগ্রহণের সময় যাঁরা সেতুর দুই পাড়ের বিভিন্ন জায়গায় জমি ক্রয় করেছেন তাঁরাই বর্তমানের চেয়ে অনেক কম মূল্যে জমি কেনার সুযোগ পেয়েছেন। সেই সুযোগ এখন আর নেই।

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি আরও জানান, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের দুই পাশে শিল্পায়নের চেয়ে আবাসন প্রকল্পের জমি বেশি। একের পর এক আবাসন প্রকল্পের সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। সেতুকে ঘিরে দুই পাড়ে গড়ে উঠছে নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরুর পর মুন্সীগঞ্জের লৌহজং, শ্রীনগর ও সিরাজদীখান উপজেলার ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে সংলগ্ন এলাকায় ফসলি জমি ক্রয় করেছেন বিভিন্ন গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। অনেকে ফসলের জমিও ক্রয় করেছেন। এতে খাদ্যশস্য উৎপাদনে সংকট সৃষ্টি হবে।

বিষয় : পদ্মাপাড় জমির দাম

মন্তব্য করুন