ভয়াবহ বন্যায় দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন সুনামগঞ্জের ছাতক অঞ্চলের মানুষ। বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে জীবন বাঁচানোর কঠিন লড়াইয়ের কথা জানালেন তাঁদেরই একজন। নাম আব্দুল লতিফ।
বন্যার সময় বানের পানির তোড়ে ভেসে গিয়েছিলেন কর্মসংস্থান ব্যাংক, ছাতক শাখার ব্যবস্থাপক আব্দুল লতিফ। তীব্র স্রোতের বিরুদ্ধে চার ঘণ্টা লড়াইয়ের পর আশ্রয় খুঁজে নেন প্রায় ডুবে যাওয়া একটি গাছের ডালে। চারদিকে অথৈ পানি। কোনো সাহায্য আসবে কিনা তা নিয়েও ছিল শঙ্কা। এমন অবস্থার মাঝেই টানা ২৬ ঘণ্টা টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যান। রাত কাটিয়েছেন গাছের ডালেই। ক্ষুধা মেটাতে খেয়েছেন লতাপাতা ও কাঁচা মাছ। অবশেষে উদ্ধার পেয়েছেন স্থানীয়দের সহায়তায়। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে সেই ভয়াল অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন লতিফ।
আব্দুল লতিফ বলেন, ব্যাংকের কিছু কাজ ছিল। তাই ১৬ জুন দুপুর ২টা নাগাদ কর্মস্থল থেকে বেরিয়ে পড়েন। সেদিন টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে ছাতক-সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক অনেকটাই ডুবে যায়। ছাতক থেকে ছোট একটি নৌকায় চড়ে যাওয়াখাড়া সেতু এলাকার দিকে যাওয়ার সময় প্রবল স্রোতে ভেঙে যায় নৌকাটি। কোনো রকমে এক জায়গায় পানিতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন অন্য নৌকার জন্য। বিকেল ৫টা নাগাদ আরও পাঁচজনের সঙ্গে একটি নৌকায় চড়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ১০ মিনিট পর সেটিও ডুবে যায় স্রোতের ধাক্কায়। নৌকার মাঝিসহ অন্যরা সাঁতরে উঁচু স্থানে উঠতে পারলেও ভেসে যান বানের টানে। সেখান থেকেই শুরু হয় জীবন বাঁচানোর সংগ্রাম।
ভাঙা গলায় লতিফ বলতে থাকেন, ঢলের পানির প্রবল স্রোতের প্রথম ধাক্কাতেই জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। স্রোতের বিপরীতে সাঁতরে দ্রুত শরীর নিস্তেজ হয়ে আসতে থাকে। স্রোতের সঙ্গে ভাসতে থাকেন অজানার উদ্দেশ্যে। সঙ্গে থাকা সবকিছুই পানিতে ভেসে যায়। মাথার ওপর বিরামহীন বৃষ্টি, নিচে ঠান্ডা পানির তীব্র স্রোত। অন্ধকারের মাঝেই হঠাৎ ধাক্কা খেলেন একটি গাছের সঙ্গে। তার ডাল আঁকড়ে ধরে আস্তে আস্তে চড়ে বসলেন। পরদিন একটি ঘরের টিনের চালায় আশ্রয় নেন। গাছের লতাপাতা আর নাগালে পাওয়া কাঁচা মাছ খেয়ে শান্ত করেন ক্ষুধার যন্ত্রণা। একেকটি মুহূর্ত মনে হচ্ছিল অনন্তকালের মতো। পরে স্থানীয়রা দোয়ারাবাজারের সেই ঘরের চালা থেকে তাকে উদ্ধার করেন।