মেঘনার ভাঙনে ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়েছে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার চরলক্ষ্মীপুর গ্রাম। গত ১৬ জুন থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৬টি বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যালয়, জমিসহ অন্যান্য ঘরবাড়িও ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। এর জন্য অবৈধভাবে বালু তোলাকে দায়ী করছেন গ্রামের বাসিন্দারা।
সরেজমিন উপজেলার মেঘনাবেষ্টিত কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের ওই গ্রামে ভাঙনের ভয়াবহ চিত্র দেখা মেলে। ওই ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত চরলক্ষ্মীপুরের একমাত্র মসজিদটি আগেই মেঘনার পেটে গেছে। একমাত্র যে প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখানে অবস্থিত, সেই ১১৮ নম্বর চরলক্ষ্মীপুর নজরুল ইসলাম বাবু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শৌচাগার ও একটি কক্ষ গত ক'দিনে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ওই বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ও সদাসদী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক বলেন, তাঁদের গ্রামে প্রায় ২০০ পরিবারের এক হাজার মানুষের বসবাস। তাঁদের বেশিরভাগই দরিদ্র মৎস্যজীবী ও কৃষক। মেঘনার ভাঙনে তাঁরা ঘরবাড়ি ভাঙনের আতঙ্ক নিয়ে দিন পার করছেন।
এক সপ্তাহের মধ্যে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন ওই গ্রামের এরশাদ আলী, হক, রশিদ, রুস্তম আলী, স্বপন ও রহম আলী। এরশাদ আলী বলেন, নদী ঘরবাড়ি কেড়ে নেওয়ায় কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। গাছতলায় বসবাস করতে হবে। একই রকম মন্তব্য করেন অন্যরাও।
মেঘনার ভাঙনের জন্য অবাধে বালু তোলাকে দায়ী করেন গ্রামবাসী। স্থানীয় সূত্র জানায়, ৫০-৬০ জনের একটি প্রভাবশালী চক্র চরলক্ষ্মীপুরসহ কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের অন্যান্য এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু তোলায় জড়িত। এই চক্রে পাশের কুমিল্লা জেলার মেঘনা উপজেলার চালিভাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান লতিফ সরকার, একই উপজেলার তাহের আলী, আবুল কাশেম, আনোয়ার হোসেন মোস্তফা, সানাউল্লাহ, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার আনন্দবাজারের সিরাজুল ইসলাম, রূপচাঁন, নবী হোসেন, দিলু মিয়া, আমির হোসেন, সুন্দর আলীসহ অনেকেই আছেন। বালু তুলতে বাধা দিলে এই চক্রের পালিত সন্ত্রাসীরা গ্রামবাসীর ওপর হামলা চালায়। তবে এসব বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য নেওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, স্থানীয় প্রশাসন অভিযান চালালে অন্য এলাকার বালুদস্যুরা সটকে পড়ে। প্রশাসনের লোকজন চলে যাওয়ার পর আবার শুরু করে এসব অপকর্ম। যে কারণে ভুগতে হচ্ছে চরলক্ষ্মীপুরবাসীকে।
আড়াইহাজারের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ব্ল্যাক-হোয়াইটের সভাপতি মহিতুল ইসলাম হিরু বলেন, চরলক্ষ্মীপুরের এই ভাঙন আকস্মিক দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে এটি রোধ করা যেত। এর জন্য প্রশাসনের উদাসীনতাকে দায়ী করেন তিনি। ভাঙনের শিকার গ্রামবাসীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও দাবি জানান।
আড়াইহাজারের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহাদাৎ হোসেন বলেন, তিনি উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা রোজিনা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে ওই এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি ও বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন। সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। ভাঙনের মুখে থাকা প্রাথমিক বিদ্যালয়টি জরুরি ভিত্তিতে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
বালু তোলার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কারণেই চরলক্ষ্মীপুর ভাঙনের মুখে পড়েছে বলে মনে করেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মুজাহিদুর রহমান হেলো সরকার। তিনি বলেন, এ কারণে আগেও গ্রামটিতে মেঘনার ভাঙন দেখা দিয়েছিল। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তিনি বিষয়টি উপস্থাপন করবেন।