নারায়ণগঞ্জ নগরে দৌলত হোসেন ওরফে দৌলত মেম্বার (৬০) প্রতিপক্ষের হাতে খুন হয়েছেন। রোববার রাতে গোগনগর ইউনিয়নের গোগনগর ব্রিজের সামনে প্রতিপক্ষ ‘বিচ্ছু বাহিনী’র হামলায় আহত দৌলত হোসেনকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মধ্যরাতে তিনি মারা যান।

দৌলতের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সোমবার পুরো গোগনগর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনার ৭ দিন আগে দৌলত হোসেনের বাহিনীর হামলায় গুরুতর আহত হন হাবিবুর রহমান ও রবিন আহমেদ নামে দু’জন।

এদের মধ্যে থাইল্যান্ডের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিন আহমেদ (৪০) রোববার রাতে মারা যান। এ খবর পেয়ে রবিন হত্যার বদলা নিতে রবিনের গড়ে তোলা ‘বিচ্ছু বাহিনী’র সদস্যরা রোববার রাতে দৌলত মেম্বারের ওপর হামলা চালায়।

নিহত দৌলত গোগনগর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার। আর থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া রবিন আহমেদ পাশের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার রুবেল আহমেদের বড় ভাই। দৌলত ও রবিন আহমেদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করছেন গোগনগর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার আওলাদ হোসেন।

নিহত দৌলত নারায়ণগঞ্জ জেলা কৃষক লীগের বিলুপ্ত কমিটির সাবেক সহসভাপতি ছিলেন। দৌলত গোগনগর ও সৈয়দপুর এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজি ও মাদক মামলা রয়েছে। তার দুই ছেলে কাশেম সম্রাট ও ফয়সালের বিরুদ্ধেও নানা অপরাধের মামলা রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, সম্প্রতি এলাকার একাধিক জমি নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে থানায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করে। এক পক্ষে ছিল রবিন আহমেদ ও অপর পক্ষে ছিল লুৎফর রহমান। ওই সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারিতে অনেকে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে রবিনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় দৌলত মেম্বার ও তার লোকজন। এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা ছিল।

২০ জুন রাতে দৌলত মেম্বারের বড় ছেলে কাশেমের নেতৃত্বে একটি দল চরসৈয়দপুরে লুৎফর রহমানের মালিকানাধীন হাজী আহাম্মদ আলী ডকইয়ার্ডে হামলা চালিয়ে হাবিবুর রহমান ও রবিন আহমেদকে কুপিয়ে আহত করে। ওই ঘটনায় দৌলত মেম্বারের ছেলে কাশেমকে প্রধান আসামি করে ১৫ জনের নামে সদর মডেল থানায় মামলা করেন লুৎফর রহমান।

সেই ঘটনায় আহত রবিনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে পাঠান গোগনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফজর আলী। নিহত রবিন ও তার ছোট ভাই ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার রুবেল আহমেদ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ফজর আলীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

নিহত রবিন আহমেদ গোগনগরে ‘বিচ্ছু বাহিনী’র প্রধান হিসেবে পরিচিত। তার গড়ে তোলা ‘বিচ্ছু বাহিনী’তে তিন শ সদস্য রয়েছে। এদের মধ্যে দেড় শ কিশোর এবং বাকিরা প্রাপ্তবয়স্ক। রবিনের গড়ে তোলা এই ‘বিচ্ছু বাহিনী’র মাধ্যমে গোগনগরের অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন চেয়ারম্যান ফজর আলী।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, দৌলত মেম্বার পুলিশের তালিকাভুক্ত চিহ্নিত অপরাধী। তার বিরুদ্ধে একাধিক চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে। এলাকায় সে ‘ভয়ংকর দৌলত’ নামে পরিচিত ছিল। তার দুই ছেলে কাশেম সম্রাট ও ফয়সাল দু’জনই সন্ত্রাসী।

এর আগে করিম নামে এক ব্যক্তিকে হত্যা করে তার বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছিলেন দৌলত। ওই ঘটনায় এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে তার বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল। এলাকায় সে এতোটাই ভয়ংকর ছিল যে তার বিরুদ্ধে কেউ মামলা করারও সাহস পায় না।

২০১৬ সালে চরসৈয়দপুরে একটি পরিবহন কোম্পানির অফিসে সিমেন্ট কারখানার শ্রমিক জসিম উদ্দিনকে হত্যা করে লাশ ওই পরিবহন কোম্পানির অফিসে লুকিয়ে রেখেছিল দৌলতের লোকজন। সর্বশেষ নানা অপকর্মের হোতা দৌলত মেম্বার ২০১৯ সালের ১ মে পুলিশের ব্লকরেইডে গ্রেপ্তার হয়েছিল।

এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য গোগনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফজর আলীকে একাধিকবার ফোন করা হলেও কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা যায়নি।

নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি আনিচুর রহমান বলেন, পরিস্থিতি নিযন্ত্রণে গোগনগরে পুলিশ মোতায়েন আছে। নিহতের পরিবার মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ঘটনার ৭ দিন আগে দৌলত মেম্বারের বাহিনীর হামলায় থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিন আহমেদও মারা গেছেন।