সাগরপাড়ের জনপদ বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার অর্থনীতি পুরোটাই মৎস্যসম্পদনির্ভর। সেখানকার 'সরকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র' (বিএফডিসি) দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান। জেলে-আড়তদার, পাইকার, বরফকল মালিক, শ্রমিকসহ ১০ সহস্রাধিক মানুষের কর্মসংস্থান এখানে। এক দিনে ১০ কোটি টাকা লেনদেনেরও দৃষ্টান্ত রয়েছে এ মোকামে। মৎস্য বাণিজ্যের এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি রাজনীতির দুষ্টচক্রের কবলে পড়েছে। কৌশলে এটিকে অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার চেষ্টা চলছে।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, অকার্যকর করার অংশ হিসেবে বিএফডিসি বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বিকল্প মোকাম স্থাপন করেছেন আড়তদাররা। শুরুতে চার দফা, পরে বিএফডিসির ব্যবস্থাপক লেফটেন্যান্ট লুৎফর রহমানের অপসারণের একদফা দাবিতে আড়তদাররা গত শনিবার এ পদক্ষেপ নিয়েছেন। ফলে ৪০ বছরের আগে প্রতিষ্ঠিত পাথরঘাটা বিএফডিসির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

পাথরঘাটা বিএফডিসি সূত্র জানিয়েছে, মাছ ক্রয়-বিক্রয়ে শতকরা ১ টাকা ২৫ পয়সা হারে টোল বাবদ প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব আয় ঈর্ষণীয়। ২০১৯-২০ সালে আয় হয়েছে ১ কোটি ৭১ লাখ ৮৩ হাজার ৮৯৫ টাকা। ২০২০-২১ সালে ৮৩ লাখ ৬০ হাজার ৭৭০ টাকা এবং ২০২১-২২ সালে ১ কোটি ৫৭ লাখ ৯৩ হাজার ২৪০ টাকা। যে কোনো উপায়ে বিএফডিসি অচল হলে বিকল্প মোকাম স্থাপনের মাধ্যমে ওই পরিমাণ অর্থের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে একটি গোষ্ঠী।
১৯৮১ সালে বরিশাল নগরী ও বরগুনার পাথরঘাটায় বিএফডিসি প্রতিষ্ঠা করে মৎস্য অধিদপ্তর। স্থানীয় রাজনৈতিক দুষ্টচক্রের কবলে পড়ে বরিশাল বিএফডিসি আজ পর্যন্ত চালু করা যায়নি। নগরের পোর্ট রোডে মৎস্য মোকাম স্থাপন করে চলছে কোটি কোটি টাকার ইজারা বাণিজ্য। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় ব্যবসায়ীদের বিএফডিসিতে যেতে বাধ্য করেছিল সেনাবাহিনী। দলীয় সরকার এলে তাঁরা আবার ফিরে গেছে পোর্ট রোডে।

পাথরঘাটার দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, বিএফডিসির ভাগ্যও বরিশাল বিএফডিসির মতো করার চেষ্টার পেছনে রয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালী এক জনপ্রতিনিধি। আড়তদারদের আন্দোলনের পেছনে রয়েছেন তিনি এবং ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কিছু নেতা।

সূত্র জানায়, আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ৫-৬ জনের কাছে খাজনা বাবদ প্রায় ৫৬ লাখ টাকা পাবে পাথরঘাটা বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ। বিএফডিসি অচল হলে বকেয়া না দিয়েই পার পেয়ে যাবেন আড়তদার সমিতির নেতারা।
বিএফডিসির ব্যবস্থাপক লেফটেন্যান্ট লুৎফর রহমান সমকালকে বলেন, তিনি বকেয়া টাকার জন্য চাপ দেওয়ার পরই কথিত আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে। প্রভাবশালী আড়তদাররা জেলে ও পাইকারসহ অন্য ব্যবসায়ীদেরও জিম্মি করে ফেলেছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) পাথরঘাটার সভাপতি নুরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, অনেক বছর ধরে সেখানে চাঁদাবাজিসহ নানা নৈরাজ্য চলছে। একাধিকবার নেতৃত্ব পরিবর্তন করা হলেও তাঁদের নীতির পরিবর্তন হয়নি।
আড়তদার সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর জোমাদ্দার বলেন, ৪ দফা দাবিতে গত ২৪ মে থেকে মৎস্যজীবীরা আন্দোলন করছেন। গত ৯ জুন বিএফডিসি চেয়ারম্যান মো. হেমায়েত উদ্দিন (উপ-সচিব) পাথরঘাটায় এসে মৎস্যজীবী সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। দাবিগুলো মেনে নেওয়ার জন্য ১০ দিনের সময় দেন তাঁরা। নির্ধারিত সময়ে দাবি না মানায় মৎস্যজীবীরা ব্যবস্থাপকের অপসারণের একদফা দাবিতে বিএফডিসিতে মাছ ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ করে দিয়েছেন।
জাহাঙ্গীর জমাদ্দার বলেন, মতবিনিময় সভাতেই তাঁরা জানিয়ে দিয়েছেন যে, দাবি না মানলে প্রয়োজনে পৌরসভার পাইকারি বাজারে বিনা খাজনায় মাছ বিক্রি করবেন।

পাথরঘাটা পৌর মেয়র আনোয়ার হোসেন আকন বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএফডিসির সঙ্গে তাঁদের কোনো বিরোধ নেই। পৌর কর্তৃপক্ষ তাঁদের মতো করে মাছের নতুন পাইকারি বাজার চালু করবে।

বিএফডিসি পাইকার সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্বাস উদ্দিন জানান, তালতলী উপজেলার সেনাকাটা ইকোপার্ক এলাকায় বিএফডিসি উপকেন্দ্র চালু হওয়ায় পাথরঘাটার জেলেরা সেখানে গিয়ে মাছ বিক্রি করছেন। এতে জেলেদের দাদন দেওয়া পাথরঘাটার মৎস্য ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। এ জন্য মৎস্যজীবীরা আন্দোলনে নেমেছেন।

তালতলীতে মাছ ক্রয়-বিক্রয়ের নতুন উপকেন্দ্র প্রসঙ্গে বিএফডিসি ব্যবস্থাপক লেফটেন্যান্ট লুৎফর রহমান দাবি করেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য উদ্যোগী হয়ে তালতলীতে উপকেন্দ্র করেছেন। এতে আমার কোনো হাত নেই।
পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হোসাইন মুহাম্মদ আল মুজাহিদ জানান, বিএফডিসির সমস্যার বিষয়গুলো তিনি অবগত। সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছেন।