সিলেট নগরীর তেররতন এলাকার বন্যাকবলিত হাজারো বস্তিবাসী অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। নগরীর নিম্নাঞ্চলের বেশিরভাগ বস্তি এখনও পানিতে তলিয়ে রয়েছে। ফলে নগরীর সাড়ে ৫ হাজারেরও বেশি বস্তিবাসী এখনও আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। নগরীর বিভিন্ন স্কুলে স্থাপিত আশ্রয়কেন্দ্র থেকে তাঁদের চলে যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে বস্তির মালিকরা ভাড়া দেওয়ার জন্য তাঁদের তাগিদ দিচ্ছেন।

এবারের বন্যায় বাস্তুচ্যুত হন নগরীর লক্ষাধিক বস্তিবাসী। এর এক-তৃতীয়াংশ বর্তমানে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। তেররতনের সোনা মিয়ার কলোনির বাসিন্দা কাঞ্চন মিয়া বলেন, হাতে কোনো টাকা ও কাজ নেই, খাবার সংকটও আছে। এদিকে মাস শেষ হচ্ছে। কলোনি মালিকের ঘর ভাড়া কীভাবে দেব? তিনি বলেন, গত মে মাসের মাঝামাঝি তাঁরা বন্যাকবলিত হলেও কলোনির মালিককে ঘর ভাড়া দিতে হয়েছে। এবারও সময়মতো ভাড়া দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। কীভাবে ভাড়া দেবেন সেই চিন্তায় অস্থির তিনি। বস্তিবাসীদের দেখার কেউ নেই বলে আক্ষেপ করেন কাঞ্চন মিয়া।

সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা আবুল ফজল খোকন জানান, নগরীর ২৭ ওয়ার্ডে ১৯ হাজারের মতো বস্তি রয়েছে। এসব বস্তিতে লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করেন। বন্যায় সবক'টি বস্তি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বর্তমানে এক-তৃতীয়াংশ বস্তিবাসী পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। তিনি বলেন, আগের চেয়ে বর্তমানে সিটি করপোরেশনের আয়তন দ্বিগুণ হয়েছে। তবে বর্ধিত অংশের বস্তির কোনো তথ্য তাঁদের কাছে নেই।

নগরীর ভেতরের আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সিসিকের তত্ত্বাবধানে থাকলেও ত্রাণ বিতরণসহ তাঁদের তদারকির অভাব রয়েছে। এমনকি নগরীতে কতগুলো আশ্রয়কেন্দ্র চালু রয়েছে, তাও সঠিকভাবে বলতে পারেননি আশ্রয়কেন্দ্রের তদারকির দায়িত্বে থাকা সিসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী রুহুল আলম। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখনও ১৫টির মতো আশ্রয়কেন্দ্র চালু রয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ২২০০ থেকে ২৩০০ বন্যার্ত রয়েছেন। তবে গতকাল বিকেলে সিলেট জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুয়ায়ী, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৫ হাজার ৭৭৭ জন বন্যার্ত রয়েছেন।

নগরীর অধিকাংশ এলাকার পানি কমতে থাকায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো বন্ধ করতে চাইছে সংশ্নিষ্ট স্কুল কর্তৃপক্ষ। তেররতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রিত রাহিমা জানান, তাঁদের চলে যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় সামলাল মিয়ার কলোনির বাসিন্দা রাহিদা বেগম বলেন, কলোনিতে এখনও পানি। তাই বাড়ি ফিরতে পারছি না। বিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু করতে হবে বলে একই আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা রিপা বেগমকেও কলোনিতে ফিরে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এখানে বর্তমানে ২০-৩০ জনের মতো রয়েছেন; যাঁদের কলোনির ঘরে এখনও পানি।

এখানে আশ্রয় নেওয়া মাফিয়া বেগমের স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন। ৫ ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে খুব কষ্টে আছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার নেই, পানিও দেওয়া হয় না। তবে সিসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী রুহুল আলম দাবি করেন, আশ্রয়কেন্দ্রে ফ্রি খাবারসহ নানা সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। এই সুযোগ-সুবিধার জন্য অনেকে আরও কিছুদিন থাকতে আগ্রহী হতে পারে। তবে তাঁদের চলে যেতে চাপ দেওয়ার কোনো তথ্য তাঁর কাছে নেই। কাউকে জোর করে চলে যেতে বলার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তেররতন এলাকার সেকর মিয়ার কলোনির জুবেদা, জামেলা; শামসু মিয়ার কলোনির মরিয়র, সোনা মিয়ার কলোনির সমলা, বিউটিদের সবাই বাড়ি ভাড়া নিয়ে উৎণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন। টিনের তৈরি কলোনির প্রতিটি কক্ষের জন্য দুই থেকে ৩ হাজার টাকা ভাড়া গুনতে হয় বস্তিবাসীকে। বন্যায় গৃহবন্দি মানুষ জানিয়েছে, ভাড়ার চাপে পরিবার নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন তাঁরা।

এদিকে জেলায় ৪৫ হাজার ৭৯৬ জন বন্যার্ত এখনও আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। এ অঞ্চলের প্রধান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারার পানি ধীরে ধীরে কমছে। তবে বিয়ানীবাজার, ওসমানীনগর, বালাগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমা, জকিগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, সদর, কানাইঘাট, বিশ্বনাথ, জৈন্তাপুর উপজেলায় হাজারো মানুষ এখনও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।

বন্যার পানি পুরোপুরি না কমায় জেলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ কাজও কার্যত শুরু হচ্ছে না। গতকাল পর্যন্ত সরকারি হিসাবে জেলায় ২ হাজার ৫৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয়। এতে প্রায় ৪ লাখ ১৭ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলে প্রায় ২২ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। বন্যায় ২৯ হাজার ঘরবাড়ি ও প্রায় ২৯ হাজার হেক্টর ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অসংখ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও সমন্বয়ের অভাবে অনেকে দফায় দফায় ত্রাণ পেলেও কেউ কেউ কিছুই পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণে সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) সঙ্গে সভা করেছেন জেলা প্রশাসক মজিবর রহমান। তিনি জানান, সভায় দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, ওষুধ সরবরাহ, বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা, বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

ত্রাণ পৌঁছানোর দাবি বাম জোটের :সিলেট-সুনামগঞ্জসহ বন্যাকবলিত এলাকায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে ত্রাণ ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছানোর দাবি জানিয়েছেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতারা। গতকাল সোমবার জোটের কেন্দ্রীয় নেতারা সিলেটের বন্যা এলাকা পরিদর্শনে শষে বিকেলে নগরীর জিন্দাবাজারে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ দাবি জানান। নেতারা বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ব্যবস্থা, কৃষিঋণ ও এনজিও ঋণ মওকুফ, হাওরাঞ্চলের অপরিকল্পিত উন্নয়ন বন্ধ করে প্রকৃতি পরিবেশ রক্ষা করে বন্যার প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

বাম জোটের সিলেট জেলা সমন্বয়ক আবু জাফরের সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাসদের কেন্দ্রীয় সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, ইউসিএলবির কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নজরুল ইসলাম, বাসদের (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মাসুদ রানা প্রমুখ।