উজানের পাহাড়ি ঢলে রংপুর বিভাগে দ্বিতীয় দফায় বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বন্যার ক্ষত না শুকাতেই আবারও বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। ফলে বন্যার কবলে পড়তে যাচ্ছেন নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল, চর ও দ্বীপচরের বাসিন্দারা। 

প্রথম দফায় বন্যায় ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে ৬ জন। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে থাকায় চরাঞ্চলের অধিবাসীদের দ্রুত আশ্রয় কেন্দ্রসহ নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে। 

ভয়াবহ বন্যার শঙ্কায় জরুরি প্রস্তুতি সভা করেছে রংপুর বিভাগীয় প্রশাসন। প্রথম দফার বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয় দফায় যেন জানমালের ক্ষতি না হয় সেদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমে সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, বিজিবি, পুলিশসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। 

নদ-নদীর পানি বাড়ছে 

উজানের পাহাড়ি ঢলে আজ বুধবার সকাল থেকে বাড়তে শুরু করেছে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, ঘাঘট, দুধকুমারসহ রংপুর বিভাগের প্রায় সব ছোট-বড় নদীর পানি। উজানের ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় বড় ধরনের বন্যার শঙ্কা রয়েছে। 

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, বুধবার বেলা ১২টায় তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ২ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৮ সে.মি, ঘাঘট নদী গাইবান্ধা পয়েন্টে বিপৎসীমার ১১১ সে.মি, ঘাঘট নদীর পানি রংপুর নগরীর ইসলামপুর পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৭৮ সে.মি ও করতোয়া নদী গাইবান্ধার চক রহিমপুর পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩৯৮ সে.মি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কুড়িগ্রামে ধরলা নদীর পানি কুড়িগ্রাম পয়েন্টে বিপৎসীমার ৮ সে.মি নিচ দিয়ে, তালুক শিমুলবাড়ি পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৩ সে.মি উপর দিয়ে, ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৭৪ সে.মি ও চিলমারী পয়েন্টে বিপৎসীমার ৫৪ সে.মি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কুড়িগ্রামের দুধকুমার নদী পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপৎসীমার ৪ সে.মি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। 

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, উজানে ভারী বর্ষণের কারণে তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া ব্যারেজ পয়েন্টে বিপৎসীমার অতিক্রম করেছে। পানি আরও বাড়তে পারে। রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার বন্যায় নিয়ন্ত্রণ বাধের বাইরে নদী অববাহিকায় বা চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্কবার্তা পাঠানোসহ স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে।

বন্যা মোকাবিলায় প্রস্তুতি 

দ্বিতীয় দফায় বন্যার শঙ্কায় রংপুর বিভাগে জরুরি সভা করেছে বিভাগীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি। বুধবার সকালে রংপুর বিভাগীয় সদর দপ্তরে বিভাগীয় কমিশনার সম্মেলন কক্ষে এ সভায় রংপুর বিভাগের বিভিন্ন সরকারী দপ্তরের কর্মকর্তাদের বন্যা মোকাবিলায় তাদের প্রস্তুতির কথা জানান। দ্বিতীয় দফা বন্যা মোকাবিলায় কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলায় ত্রাণ তৎপরতা, উদ্ধার কার্যক্রম, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, বন্যাদুর্গতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা, অসুস্থদের চিকিৎসা দেয়ার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। 

বন্যা মোকাবিলায় জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে গাইবান্ধায় ৩টি, কুড়িগ্রামে ৪টি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট পাঠানো হয়েছে। যা ঘণ্টায় ২ হাজার লিটার পানি বিশুদ্ধ করে বন্যাদুর্গতের সরবরাহ করতে পারবে। বন্যাদুর্গতদের জন্য ১ হাজার অস্থায়ী নলকূপ স্থাপন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, অস্থায়ী ল্যাট্রিনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেই সাথে বন্যাদুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে ভ্রাম্যমাণ পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। 

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ভেটেরিনারি টিম চরাঞ্চলে কাজ শুরু করছে। বন্যাপরবর্তী নানা রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় গবাদি পশুর টিকা দেয়া জন্য পর্যাপ্ত টিকা মজুত করা হয়েছে। 

প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্যাদুর্গতদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বন্যার কারণে কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় ৪৩১টি বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়। বর্তমানে মাঠ পানিতে নিমজ্জিত থাকা, চর এলাকাগুলোতে স্থায়ী শিক্ষক না থাকা এবং কিছু স্কুল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে এখনও ৪২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে কুড়িগ্রামে ১১টি, লালমনিরহাটে ২টি ও গাইবান্ধায় ১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। 

দ্বিতীয় দফায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতি রুখতে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে মৎস্যজীবীদের মাঝে প্রচারণা শুরু করা হয়েছে। জলাশয়-পুকুরগুলো জাল দিয়ে ঘিরে রাখা, বড় মাছ বিক্রি করা, ছোট মাছ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া, মাছ সরানোর সুযোগ না থাকলে ডালপালা দিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছে মৎস্য বিভাগ। আমনের আবাদ ঠিক রাখতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের দুই সেট আমনের বীজতলা প্রস্তুতের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এছাড়া বলান তৈরি করে দেরিতে আমন আবাদের পরামর্শ দিয়েছে কৃষি বিভাগ। 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে রংপুর বিভাগের প্রতিটি জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। প্রথম দফা বন্যায় নদীর ক্ষতিগ্রস্ত বাধ মেরামত, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান মেরামত করা, প্রতিটি জেলায় জিও ব্যাগ মজুত করা হয়েছে। বন্যার বার্তা জনগণের মাঝে পৌঁছে দেয়ার জন্য কমিউনিটি রেডি, বাংলাদেশ বেতারসহ স্থানীয় পত্রিকায় প্রচারের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে সভায়। 

বন্যাদুর্গতদের উদ্ধারের জন্য ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার দল প্রস্তুত রয়েছে। উদ্ধারকাজের জন্য ৪২টি বোট চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছে রংপুর ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স। বন্যার সময় ডায়রিয়া, কলেরাসহ পানিবাহিত রোগ মোকাবিলার জন্য নানা প্রস্তুতি নিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তাদের পক্ষ থেকে ৮ লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ২ লাখ সাপের বিষের প্রতিষেধক মজুত করা হয়েছে। বন্যার্তদের চিকিৎসায় রংপুর বিভাগে ৭০৪টি মেডিকেল টিম গঠন করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। 

প্রথম দফায় কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে বন্যায় ৬ জনের মৃত্যু হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় মৃত্যুর হার কমাতে স্থানীয় মসজিদ-মন্দিরে সচেতনতা বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। বন্যায় প্রকট আকার ধারণ করলে চরাঞ্চলের আশপাশে কর্তব্যরত বিজিবি’র সদস্যরা তাদের চরে থাকা জলযান দিয়ে তাৎক্ষণিক উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করবে। সেই সাথে বন্যাদুর্গতদের প্রয়োজন মাফিক বিজিবি’র মজুত রাখা রেশন ভাণ্ডার থেকে ত্রাণের ব্যবস্থা করা হবে। 

পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে বন্যার সময় দুর্গত এলাকায় টহল কার্যক্রম পরিচালনা, সক্ষমতার ভিত্তিতে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা, ত্রাণ সহায়তা প্রদান, আশ্রয় কেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করা হবে। উদ্ধার কার্যক্রম, ত্রাণ সহায়তা প্রদানসহ যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলো প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। 

রংপুর বিভাগীয় কমিশনার আবদুল ওয়াহাব ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য, বিজিবি’র কর্মকর্তা কর্নেল মো. জাকারিয়া হোসেন, ৬৬ পদাতিক ডিভিশন সদর দপ্তরের মেজর মোনাব্বির মামুন, পাউবো’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সৈয়দ নিয়াজ মোহাম্মদ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বাহার উদ্দিন মৃধা, রংপুর বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মো. হারুন অর রশিদ, মৎস্য অধিদপ্তর রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম, রংপুর মেডিকেল কলেজের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের আইন কর্মকর্তা মোছা. শাহীনা বেগম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মাহবুবর রহমান, রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. আবু জাকিরুল ইসলাম ও রংপুর জেলা রোভারের সম্পাদক মহাদেব কুমার গুন।