গাড়ি চলাচলের পথ নয়, যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত সড়ক। বন্যার জলের সঙ্গে সেই যুদ্ধ। বানের চোট নিতে পারেনি, তাই পানি নামতে থাকায় দুর্গত অনেক এলাকার সড়ক-মহাসড়কে জেগে উঠছে ক্ষত। অনেক সড়কের কাঠামো পুরোটাই বদলে টিকে আছে খোলসটা। কিছু কিছু এলাকায় সরে গেছে রাস্তা ও কালভার্টের মাটি। অনেক সড়কের শুধু উপরিভাগ নয়, মূল ভিত্তিটাও তছনছ। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এবার সড়ক-মহাসড়কে কেমন ক্ষতি হলো- সেটার চূড়ান্ত হিসাব এখনও কষতে পারেনি সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ধারণা, এই বন্যায় শুধু সিলেট জেলার অন্তত ৬০ শতাংশ সড়ক ডুবেছে। গেল মে মাসের বন্যায় সড়কে সহস্রাধিক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছিল, এবার সেই ক্ষতি তিন গুণ হতে পারে।

অন্যদিকে সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার প্রায় ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ সড়ক লন্ডভন্ড হয়েছে। জেলা সদরের সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী প্রায় ৩০০ কিলোমিটার সড়কের এখন চিহ্নও নেই।
সিলেট বিভাগের চার জেলায় সড়ক ও জনপথের (সওজ) আওতায় রয়েছে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার সড়ক; এর মধ্যে ৬০০-৭০০ কিলোমিটার সড়ক এবারের বন্যায় ১ থেকে ৫ ফুট পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যায়। সিলেটের কানাইঘাট ও গোয়াইনঘাট উপজেলার রাস্তা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। সুনামগঞ্জের সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ তিন দিন ছিল বন্ধ। সিলেটের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না হলেও আঞ্চলিক অনেক সড়কে চলেনি গাড়ি। সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমার লালাবাজার এলাকার পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে নাজুক।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্য সংকট ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে আরও বড় বন্যার শঙ্কা রয়েই গেছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি বন্যা-সহনীয় আধুনিক প্রযুক্তির টেকসই সড়ক নির্মাণ করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিলেটের হাওরাঞ্চলে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে উড়াল সড়ক নির্মাণেরও নির্দেশনা দিয়েছেন।

সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, সিলেটের যেসব সড়ক থেকে পানি নেমেছে, এর অনেকটির শুধু উপরিভাগে বিশাল গর্ত নয়, নিচের মূল ভিত্তি (বেজ ও সাববেজ) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে ছোট-বড় শত শত গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক সড়ক ও মহাসড়কের হযবরল পরিস্থিতিতে আসন্ন ঈদযাত্রায় মানুষ ভোগান্তিতে পড়বে। আর ১০ দিন পর ঈদ হওয়ায় এই অল্প সময়ে রাস্তা সংস্কারের সুযোগ নেই।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সিলেট থেকে মৌলভীবাজারের শেরপুর পর্যন্ত সড়কে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। সিলেট-হবিগঞ্জ পথের বাসচালক কামাল আহমদ বলেন, গত মাসের বন্যায় রাস্তার ব্যাপক ক্ষতি হয়। তখন ইট-বালু দিয়ে গর্তগুলো ভরাট করে দেওয়া হয়েছিল। এরপর ভারি বৃষ্টি ও বন্যার পানিতে সেগুলো সরে গেছে। রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সিলেট-নবীগঞ্জ পথের মিনিবাস চালক মানিক মিয়া বলেন, এই রাস্তায় গাড়ি চালানো কষ্টের।

সিলেট নগরীর ভেতরের রাস্তাঘাটের অবস্থাও করুণ। দুই দফায় ছয়-সাত দিন করে প্লাবিত ছিল সুবহানীঘাট, উপশহর, কালীঘাট, শেখঘাটসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকার সড়ক। এই সড়কগুলো থেকে পানি নামার পর ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত চোখে পড়ছে। নগরীর আম্বরখানা স্ট্যান্ডের সিএনজি অটোরিকশাচালক আল আমিন বলেন, কয়েক বছর ধরে নগরীর রাস্তাঘাটগুলো সংস্কার করা হচ্ছে না। পাশের ড্রেন সংস্কার করে ফেলে রাখা হয়েছে। এবারের বন্যার পানি সব রাস্তা যেন খুবলে নিয়েছে।
এক মাস আগের বন্যায় সিলেটে রাস্তাঘাটের সহস্রাধিক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছিল। সিলেট সড়ক বিভাগের ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৫০০ কোটি টাকা। আর এলজিইডির হিসাবে শুধু সিলেট জেলায় ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৩৭৭ কোটি টাকা।

সিলেট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইনামুল কবীর জানান, জেলায় তাঁদের আওতায় সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার কাঁচা ও পাকা সড়ক রয়েছে। এবার অন্তত ৬০ শতাংশ সড়ক পানিতে ডুবেছে। তিনি বলেন, সড়কে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও নিরূপণ করা যায়নি। জেলার ৯টি উপজেলায় বন্যার পানি কমলেও চারটিতে বাড়ছে। পানি কমলে জুলাইয়ের শুরুতে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হবে। গত মে মাসের মাঝামাঝি বন্যার সময় জেলায় এলজিইডির ২৫ শতাংশ রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এর মধ্যে ৪০০ কিলোমিটারের মতো পাকা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সড়কগুলো মেরামতের জন্য তখন ৩৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানানো হয়। এবারে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় তিন গুণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করেন এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী।

সিলেট সওজ সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. ফজলে রাব্বি বলেন, 'এবারের বন্যায় রাস্তাগুলোর বেজ ও সাববেজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপরিভাগের ক্ষয়ক্ষতি মেরামত বা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। যেসব রাস্তার বেজ বা সাববেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেগুলো পুনর্বাসন করতে হয়। আর যেসব রাস্তা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে, সেগুলো পুনর্নির্মাণ করতে হয়।'

ফজলে রাব্বি আরও বলেন, সিলেটে আগামী বছরও বন্যা হতে পারে। ফলে সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের বর্তমান প্রযুক্তি বাদ দিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণ করতে হবে। এ জন্য অ্যাক্রিলিক পলিমার বা জিআরটি পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণ করলে টেকসই হবে। সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। এভাবে সড়ক নির্মাণ করলে ১০-১৫ দিন পানির নিচে থাকলেও তেমন ক্ষতি হবে না।

সুনামগঞ্জের সড়কগুলো এখন অচেনা :সুনামগঞ্জ-দোয়ারা-ছাতক সড়কের অটোরিকশাচালক সিরাজ মিয়া জানান, মান্নারগাঁও এলাকার পুটিপুসি সড়কের মুখে বান্দেরবাজার যাওয়ার আগে গভীর খাল হয়ে গেছে, সেখানে এখন নৌকা চলে। ডাউকাখালি, ব্রাহ্মণগাঁও ও আমবাড়ী বাজারের পাশের সড়ক অংশে বিটুমিন উঠে গেছে। অনেক পাথর ঢলে ভেসে গেছে। বোঝাই যায় না, সেখানে কয়েক দিন আগেও সড়ক ছিল। পাশে দাঁড়ানো অটোরিকশাচালক আবদুল মতিন ও জিয়াউর রহমান বললেন, 'এই পথে গাড়ি চালাইবার আগে চিন্তা করা লাগে, বাড়িত ফিরা যাইব কিনা, গাড়ির তো বারোটা বাজব।'

এর চেয়েও খারাপ অবস্থা সুনামগঞ্জ-সাচনা-জামালগঞ্জ সড়কের। বড় বড় গর্তের মাঝেমধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাথরই জানান দেয়, ওই পথেও কয়েক দিন আগে যানবাহন চলত। এই পথে যাত্রী বহনকারী রহিমাপুরের মোটরসাইকেল চালক জগন্নাথ রায় বললেন, সুনামগঞ্জ শহরের পাশের আব্দুজ জহুর সেতুর অ্যাপ্রোচের পরের অংশে খাল হয়ে গেছে। নিধিরচর এলাকার বিকল্প সড়কের অস্তিত্বই নেই। তিনি জানান, সাচনাবাজার থেকে সুনামগঞ্জে ৪০ মিনিটের পথ দুই ঘণ্টায় ট্রলারেই যাতায়াত করছে লোকজন।

সুনামগঞ্জ-দিরাই সড়কেরও একই হাল। সড়কের গণিগঞ্জ, শরিফপুর, বোগলাখাড়াসহ ১৫ কিলোমিটার অংশের উঠে গেছে বিটুমিন। জেলা সদরের একেবারে কাছের উপজেলা বিশ্বম্ভরপুরে যাতায়াত করাও কষ্টসাধ্য এখন। সুনামগঞ্জ-জগন্নাথপুর সড়কের ১০ কিলোমিটারের অধিকাংশ এলাকায় চলাচল দায়।

সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম বলেন, এখনও বন্যা যায়নি, এর মধ্যেই জেলা সদরের সঙ্গে উপজেলার ১৮৪ কিলেমিটার সংযোগ সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ৩০টি সেতু ও কালভার্টের অ্যাপ্রোচ সড়ক ভেঙে গেছে।

সুনামগঞ্জের স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন, অধিকাংশ সড়ক এখনও পানির নিচে। প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক তছনছ হয়ে গেছে। ১২০টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি সড়ক হয়ে গেছে এবড়োখেবড়ো।