চট্টগ্রামে কোটি কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদায়ে বিভিন্ন ব্যাংক মামলা করলেও তা পরিচালনা নিয়ে একশ্রেণির ব্যাংক কর্মকর্তা নজিরবিহীন উদাসীনতা দেখাচ্ছেন। সাক্ষ্য দিতে তাঁদের আদালত সমন পাঠালেও হাজির হচ্ছেন না বছরের পর বছর। কেউ আবার মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে দায়ের করেছেন মামলা। খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলা করে এক দশকের বেশি সময় ধরে খোঁজ না রাখারও নজির আছে চট্টগ্রামে। তাঁদের নানা টালবাহানার কারণে খেলাপি ঋণের অর্থ আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আদালতের পাঠানো কারণ দর্শানোর নোটিশেই কেবল তাঁদের টনক নড়ে।

চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতের বেঞ্চ সহকারী রেজাউল করিম বলেন, আদালতে অনেকগুলো মামলা বছরের পর বছর ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। একটার পর একটা তারিখ দিয়ে যাচ্ছেন আদালত। মামলাগুলো পরিচালনায় আদালত সংশ্নিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম উদাসীনতা দেখতে পাচ্ছেন। তিনি জানান, এ কারণে অর্থঋণ আদালতের বিচারক মুজাহিদুর রহমান কয়েকটি মামলায় ব্যাংক কর্মকর্তাদের শোকজ (কারণ দর্শানো) করেছেন। আদালত কয়েকটি আদেশে কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলার কথা জানিয়ে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার জন্য তাঁদের দায়ী করেছেন।

সাক্ষ্য দিতে বাদীর অনাগ্রহ : ২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বর ৭ কোটি ৪৬ লাখ ৮ হাজার টাকা খেলাপি ঋণ আদায়ে চট্টগ্রাম টায়ার টিউব ট্রেডিং কোম্পানির মালিক ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক। ২০২০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি আদালত মামলাটি শেষ করতে চূড়ান্ত শুনানির দিন ধার্য করেন। কিন্তু এর পর থেকে গত ২৮ জুন পর্যন্ত আড়াই বছরে ১০টি ধার্য তারিখ চলে গেলেও বাদী ব্যাংকের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে কেউ আদালতে হাজির হননি। ১০ বারই সময় চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়।

এমন প্রেক্ষাপটে গত ২৮ জুন আদালত আদেশে বলেন, সময় আবেদন থেকে প্রমাণিত হয় বাদী ব্যাংক মামলা পরিচালনায় অবহেলা প্রদর্শন করছে। ব্যাংকের শাখা ম্যানেজার কার্যকারক কর্মকর্তাকে সাক্ষ্য প্রদানের জন্য আদালতে না পাঠিয়ে অন্য কাজে চট্টগ্রামের বাইরে পাঠিয়েছেন। এ রকম দায়িত্বহীনতার কারণে মামলা নিষ্পত্তিতে অস্বাভাবিক বিলম্ব হচ্ছে। এরপরই ব্যাংকটির কদমতলী শাখার ম্যানেজারের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর আদেশ দেন আদালত। এ প্রসঙ্গে ব্যাংকের আইনজীবী রিয়াদুল ইসলাম বলেন, মামলার মূল বাদী অন্যত্র বদলি হওয়ায় এ জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।

পাঁচ বছর আগে মারা যাওয়া ব্যক্তি আসামি : চট্টগ্রামে ৭৭ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায়ে পাঁচ বছর আগে মারা যাওয়া ব্যক্তিকে মামলার আসামি করে বিপাকে পড়েছেন সোনালী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার ম্যানেজার। বিষয়টি নজরে আসায় ব্যাংক কর্মকর্তাকে কারণ দর্শাতে বলেন আদালত। আদালত আদেশে বলেন, ২০১৬ সালে মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ডিক্রিদার ব্যাংক জারি মামলা দায়ের করেন ২০২০ সালে। এ মামলা দায়ের করায় প্রমাণিত হয়, ডিক্রিদার ব্যাংক বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের গ্রাহকদের নিয়মিত তদারকি করেন না।

১১ বছর মামলার খবর রাখেননি ম্যানেজার : ১৯৯২ সালের ১৯ এপ্রিল ১ কোটি ২ লাখ ১৪ হাজার ৯৩৩ টাকা খেলাপি ঋণ আদায়ে জারি মামলা করে জনতা ব্যাংক লিমিটেড লালদীঘি পূর্ব পাড় করপোরেট শাখা। ২০০৫ সালের ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। এ আদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন ঋণখেলাপি ব্যক্তি। সেই রিট হাইকোর্ট ২০১০ সালের ১০ মার্চ খারিজ করে দেন। এরপর ১১ বছর কেটে গেলেও সেই মামলার খবরই রাখেননি বাদীপক্ষ ব্যাংক ম্যানেজার। তাঁকেও আদালত কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন।

২২টি ধার্য্য তারিখে হাজির হননি কেউ : ২০১০ সালে আদালতে আরজে ফ্যাশনের দুই কর্নধার সালাম হাশেমি ও মঈনুদ্দিনের বিরুদ্ধে ১ কোটি ২৭ লাখ টাকার খেলাপি ঋণের মামলা দায়ের করেন পূবালী ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ম্যানেজার। ২০১৫ সালে ১ কোটি ৯৯ লাখ টাকার রায় পায় ব্যাংক। ওই বছরের ১ জুন অর্থ পেতে জারি মামলা করে ব্যাংক। ৫ নভেম্বর মামলার শুনানি শুরু হয়। কিন্তু তারপর ২২ বার শুনানির ধার্য দিনে আদালতে হাজির হয়নি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। গত ১ ফেব্রুয়ারি বিষয়টি নজরে আসায় পূবালী ব্যাংকের তিন ডিজিএমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন আদালত। ব্যাংকটির বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক শেখ মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা বলেন, 'ব্যাংকের প্যানেল আইনজীবীর ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমরা এখন খুবই তৎপর।'