পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হয়েছে গত রোববার থেকে। এখন বরিশাল-ঢাকা সড়কপথে মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টায় যাতায়াত করছেন মানুষ। এতে আগের তুলনায় সড়কপথে যাত্রী বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

ঢাকা-বরিশাল নৌপথে লঞ্চের যাত্রীর চাপ কমতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৫ দিনে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ যাত্রী কমেছে বলে জানিয়েছেন লঞ্চ মালিকরা। তবে নৌপথে যাত্রীদের আকর্ষণ করতে লঞ্চের ভাড়াও কমিয়েছেন তাঁরা।

এদিকে আসন্ন ঈদুল আজহায় এ নৌপথে লঞ্চের বিশেষ সার্ভিস চালানোর বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। ভাড়া কমানো, বিশেষ সার্ভিসসহ বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আগামীকাল শনিবার ঢাকায় মালিক সমিতির বৈঠক ডাকা হয়েছে।

এ নৌপথে যাত্রীর চাপ কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে সুরভী লঞ্চ কোম্পানির পরিচালক মো. রিয়াজ উল কবির বলেন, সোমবার থেকে যাত্রী সংকটের কারণে এ নৌপথে যাতায়াতকারী সব লঞ্চের ভাড়া কমানো হয়েছে। তিনি জানান, এক শয্যার সাধারণ কেবিন ১ হাজার ২০০ টাকার স্থলে এখন নেওয়া হচ্ছে ৮০০ টাকা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এক শয্যার কেবিনের ভাড়া ১৪০০ থেকে ৪০০ টাকা কমিয়ে নেওয়া হচ্ছে ১ হাজার টাকা। সাধারণ ডাবল কেবিনের ভাড়া আগে ছিল ২ হাজার টাকা। এখন তা থেকে ২০০ টাকা কমানো হয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডাবল কেবিনের ভাড়া ৫০০ টাকা কমিয়ে ২ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। তৃতীয় শ্রেণির বা ডেকের ভাড়া ৩৫০ টাকা থেকে কমানো হয়েছে ১৫০ টাকা।

লঞ্চ মালিকরা ভাড়া কমিয়েছেন বলে জানিয়েছেন অভ্যন্তরীণ নৌযান চলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্থার কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও সুন্দরবন লঞ্চ কোম্পানির মালিক সাইদুর রহমান রিন্টু। তিনি বলেন, 'আমরা এখনও ভাড়া কমানোর বিষয়টি অফিসিয়ালি ঘোষণা দিইনি। শনিবার ঢাকায় মালিক সমিতির সভা অনুষ্ঠিত হবে। ওই সভায় ভাড়া কমানোর বিষয়টি ঘোষণা দেওয়া হবে এবং ঈদুল আজহায় স্পেশাল ট্রিপ চলবে কিনাম তা চূড়ান্ত করা হবে।'

গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় বরিশাল নৌবন্দরে দেখা গেছে, আগের মতো যাত্রীর ভিড় নেই। লঞ্চে যাত্রী পেতে হাঁক-ডাক দিতে দেখা গেছে কলম্যানদের। তাঁরা এখন উচ্চ শব্দে কম ভাড়ায় কেবিন ও সোফা বিক্রির জন্য ডাকাডাকি করেন।

গতকাল কুয়াকাটা-২ লঞ্চের ২৫০টি কেবিনের মধ্যে বিক্রি হয়েছে ৭৮টি। অ্যাডভেঞ্চার-১ লঞ্চে ১৬৫টি কেবিনের মধ্যে বিক্রি হয়েছে ৭৫টি। পারাবত-১২ লঞ্চের ২৪০টি কেবিনের মধ্যে বিক্রি হয়েছে ১২০টি এবং সুন্দরবন-১১ লঞ্চের ২৪০টি কেবিনের মধ্যে ১১৫টি বিক্রি হয়েছে। সুরভী-৭ ও পারাবত-৯ লঞ্চের কর্মকর্তারা বলেছেন, তাঁদেরও ৪০-৫০ শতাংশ কেবিন খালি রয়েছে।

নৌপথের যাত্রীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, তদবির ছাড়া লঞ্চের কেবিন ও সোফার টিকিট পাওয়া যেত না। ডেকের জন্যও আসন রাখতে হতো বিকেলে। ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহার সময় ঢাকা-বরিশাল নৌরুটে উভয় প্রান্ত থেকে আগাম বুকিং নেওয়া হতো। বিশেষ লঞ্চ সার্ভিসের ঘোষণা দেওয়া হতো ১০-১৫ দিন আগে। অথচ ঈদুল আজহা উপলক্ষে তেমন তোড়জোড় নেই।

যাত্রীদের মতে, পদ্মা সেতুর কারণে সড়কপথে তিন ঘণ্টায় ঢাকা-বরিশাল যাতায়াতের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় লঞ্চ মালিকরা চুপসে গেছেন। এখন তাঁরা যাত্রী ধরে রাখার জন্য ভাড়া কমানোসহ সেবা বাড়ানোর নানা উপায় খুঁজছেন।

বরিশাল নৌযাত্রী ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক দেওয়ান আব্দুর রশিদ নিলু বলেছেন, এতদিন লঞ্চ মালিকরা যাত্রীদের জিম্মি করে ইচ্ছামতো ব্যবসা করেছেন। পদ্মা সেতু লঞ্চ মালিকদের দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছাচারিতার দেয়াল ভেঙে দিয়েছে।

কুয়াকাটা-২ লঞ্চের যাত্রী মীর মহসিন ঢাকায় ব্যবসা করেন। লঞ্চে ১০ বছর ধরে যাতায়ত করেন। তিনি বলেন, আজ (গতকাল) মনে হয়েছে যাত্রীদের বেশ কদর করছেন লঞ্চ স্টাফরা।

লঞ্চে যাত্রী কমে যাওয়ার বিষয়টি বরিশাল নৌবন্দর কর্মকর্তা ও বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমানও স্বীকার করেছেন।