লগ্নি হয়েছে কোটি কোটি টাকা। প্রস্তুত গরু ব্যবসায়ী, কসাই আর গ্রামে গ্রামে শত শত দালাল। ছক ধরে ঈদের আগেই দালালদের হাতে হাতে চলে যাচ্ছে নগদ টাকা। কোরবানির চামড়া সংগ্রহ আর সংরক্ষণের অঙ্কটাও মেলানো শেষ। অপেক্ষা কেবল কোরবানির। এরপর পাচারের পালা। ধারণা করা হচ্ছে, উত্তরাঞ্চলের কোরবানি পশুর ৬০ শতাংশ চামড়া সীমান্ত ডিঙিয়ে চলে যেতে পারে ওপারে। সক্রিয় একাধিক চামড়া ব্যবসায়ী চক্র নিশ্চিত করেছে এসব তথ্য।
উত্তরের সীমান্তসংলগ্ন ভারতের কোচবিহার জেলা। এ অঞ্চল দিয়ে প্রতিবছরই কোরবানির পর বাধাহীনভাবে চামড়া চলে যায় ভারতে। কোরবানির দিন থেকেই আগ্রাসী হয়ে ওঠে চোরাকারবারিরা। নীলফামারী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, লালমনিরহাটের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে চামড়া পাচারের জন্য জাল বিছায় শক্তিশালী সিন্ডিকেট। পাঁচ বছর ধরে উত্তরের সীমান্ত দিয়ে পাচারের কারণে এই অঞ্চল থেকে দেশীয়ভাবে চামড়া সংগ্রহ কমেছে। উত্তরাঞ্চলের ব্যবসায়ীদের নড়বড়ে অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে ভারতীয় মহাজনরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এবারও সপ্তাহখানেক আগে থেকেই ভারতীয় সংঘবদ্ধ চোরাই সিন্ডিকেট এই অঞ্চলের সীমান্তসহ বিভিন্ন হাটবাজারে যাওয়া-আসা শুরু করেছেন। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন এদেশের দালাল ও ফড়িয়া গোষ্ঠী। দুই দেশের চোরাকারবারি সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকার অর্থলগ্নি করে কোরবানির দিন থেকেই এই অঞ্চলের হাটবাজার থেকে চামড়া কেনার ছক কষেছে।
নীলফামারীর ফড়িয়া ব্যবসায়ী আজমল খান বলেন, 'দেশীয় বাজারের চেয়ে ওপারের চামড়ার দর অনেক বেশি। এ ছাড়া আমাদের এখানে মূলধনের অভাব। আর পাচার করা চামড়ার জন্য সুদ ছাড়া মোটা অঙ্কের আগাম পুঁজি পাওয়া যায়। এতে করে অনেক ব্যবসায়ী উৎসাহী হয়।'

যদিও গত বুধবার কোরবানির পশুর চামড়া পাচার রোধে এবার কঠোর পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেছেন, চামড়া পাচার রোধে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হবে। সীমান্ত এলাকায় বিজিবি বাড়াবে তৎপরতা, পুলিশও থাকবে সজাগ।

এরই প্রেক্ষাপটে বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ (বিজিবি) কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী ও বড়াইবাড়ী, লালমনিরহাটের মোগলহাট, পাটগ্রাম ও বড়খাতা, নীলফামারীর ডোমার ও চিলাহাটি, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া ও দেবীগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওয়ের রুবিয়া, দিনাজপুরের হাকিমপুর, বিরামপুর, নবাবগঞ্জ ও হিলি, রাজশাহীর গোদাগাড়ি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ, শিবগঞ্জ, ভোলাহাটসসহ পুরো সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে।

পঞ্চগড়-১৮ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মাহফুজুল হক বলেন, 'আমাদের সীমান্ত এলাকা ২৮০ কিলোমিটার অংশে বিশেষ টহল দেওয়া হচ্ছে। চোরাকারবারিরা কোনো সুযোগ এই অঞ্চলে নিতে পারবে না। শুধু চামড়া পাচারই নয়, ভারতীয় গরুও যাতে এই দিক দিয়ে না আসে সেজন্য সজাগ রয়েছে জোয়ানরা।'

২০১৯ ও ২০২০ সালে দেশে কোরবানি পশুর চামড়া নিয়ে তৈরি হয়েছিল হযবরল পরিস্থিতি। দাম না পেয়ে অনেক স্থানে চামড়া সড়কে ফেলে এবং মাটিতে পুঁতে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। আবার সময়মতো লবণ না দেওয়া, বৃষ্টি ও গরমের কারণেও ২০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। নষ্ট হওয়া চামড়ার আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় আড়াইশ কোটি টাকা।

ওই দুই বছর ঢাকায় লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দর নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪৫-৫০ টাকা। অথচ ঈদের দিন বিকেলে ঢাকায় ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ৮০০ টাকায় গরুর চামড়া বিক্রি হয়। জেলা শহরের বাইরের চিত্র ছিল আরও ভয়াবহ।
আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনা করে ২০২১ সালে কিছুটা দাম বাড়িয়ে কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল। লবণজাত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ঢাকায় ৪০-৪৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৩-৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে গত বছরও পড়ে যায় চামড়ার দাম।

কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে চাহিদামাফিক লবণ সরবরাহের ব্যবস্থা, পাচার ঠেকাতে ঈদের পর অন্তত ৩০ দিন সীমান্ত এলাকায় টহল বাড়ানো এবং চামড়া কেনার জন্য ঋণ সরবরাহে ব্যাংক ও সংশ্নিষ্ট সবার সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ)।

বিটিএ সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ৩০ দিন সীমান্ত এলাকা দিয়ে চামড়া যাতে পাচার না হয়, সে ব্যাপারে বিজিবি ও পুলিশের টহল বাড়ানোর নির্দেশনা দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনুরোধ জানিয়েছে। কারণ চামড়া একটি পচনশীল পণ্য, যা দ্রুত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হয়। সারাদেশ থেকে বিভিন্ন আড়তের মাধ্যমে সংগৃহীত চামড়া কিনতে হয়, এ জন্য প্রয়োজন হয় নগদ টাকার। এ কারণ মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনে আড়তে বিক্রি করে। তাদের হাতে টাকা না থাকলে তৃতীয় পক্ষ এই সুযোগ নিয়ে নেয়।

বগুড়া জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন সরকার বলেন, 'কয়েক বছরে আমার প্রায় ১০ কোটি টাকা ট্যানারি মালিকদের কাছে আটকে আছে। প্রতিবছর এই টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে তা আর দেই না।'
বগুড়ার পর উত্তরের চামড়ার বড় বাজার জয়পুরহাটে। ট্যানারি মালিকদের কাছে কোটি কোটি টাকা বকেয়া পড়ে থাকায় এবারও চামড়া কেনা নিয়ে বিপাকে রয়েছেন জয়পুরহাটের চামড়া ব্যবসায়ীরা। তাঁদের আশঙ্কা, চামড়া কিনতে না পারলে তা চোরাকারবারিদের হাতে চলে যাবে। কোটি কোটি টাকার চামড়া পাচার হয়ে যাবে ভারতে।

জয়পুরহাট শহরের আরাফাত নগর, আমতলী, পাঁচবিবি উপজেলার রেলগেট, আক্কেলপুর উপজেলার হাজিপাড়া, এলাকায় চামড়ার আড়তগুলোতে ঘুরে মিলেছে এসব তথ্য। চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্যানারি মালিকরা কয়েক বছরের কোটি কোটি পাওনা টাকা এখনও পরিশোধ করতে পারেননি। আর সীমান্ত জেলা হওয়ায় চামড়া পাচারের আশঙ্কাও এখানে বেশি।

জয়পুরহাটের চামড়া ব্যবসায়ী ফরিদুল হক জানান, তাঁরা আড়তগুলো প্রস্তুত রেখেছেন। তবে ট্যানারি মালিকদের কাছে পাওনা টাকা না পাওয়ায় বিপাকে রয়েছেন।

পাঁচবিবি উপজেলার চামড়া ব্যবসায়ী অহেদুল হোসেন ছোটন বলেন, চামড়া পাচার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাচার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে এ শিল্প লাভের মুখ দেখবে।

এদিকে চামড়া পাচার রোধে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে ফুলবাড়ী বিরামপুর বিজিবি ২৯ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আলমগীর কবির জানান, সীমান্তের যে এলাকায় তারকাঁটা নেই চোরাকারবারিরা মূলত এই জায়গাকেই পাচারের পথ হিসেবে ব্যবহার করে। তাই এই জায়গা সবসময় নজরদারির মধ্যে রাখা হয়। এখন আরও বেশি নজরদারি করা হচ্ছে।