স্বামীর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই পুত্রশোকে কাতর ইয়াসমিন বেগম। বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। প্রতিবেশীরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু 'বুলবুল আর নেই'-একথা মানতে পারছেন না তিনি।

মা ইয়াসমিন বেগম বলেন, '‘বিশ্ববিদ্যালয়ে এক মেয়ে বুলবুলকে পছন্দ করত। কিন্তু বুলবুল অন্য একটি মেয়েকে পছন্দ করার কারণে তাকে পাত্তা দেয়নি। রোববার সকালে বুলবুলের পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ওই মেয়ে 'কথা আছে' বলে তাকে ডেকে নিয়ে যায়। ওই সময়ই ছেলের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়। পরে সন্ধ্যার দিকে ওই মেয়ের সঙ্গে কথাবার্তার মধ্যেই বুলবুলকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটে।''

ইয়াসমিন বলেন, 'আমরা মা-ছেলে বন্ধুর মতো ছিলাম। তাই সে সবকিছু আমাকে বলত, কিছুই লুকাত না। গত ঈদে বাড়িতে এসে আমাকে বলে, নেত্রকোনা থেকে দুই ছেলে-মেয়ে এসে তার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে সম্পর্ক আছে। ছেলেটা খুব পছন্দ করে মেয়েটাকে। কিন্তু মেয়েটা ওই ছেলেকে পছন্দ করে না। সে পছন্দ করে বুলবুলকে, কিন্তু তার (বুলবুল) তো সম্পর্ক আরেকজনের সঙ্গে। বিষয়টি বুলবুল মেয়েটিকে বারবার বুঝাতে চাইলেও মেয়েটি বুঝতে চাইত না। আমার ধারণা, মেয়েটির পছন্দের সেই ছেলে বুলবুলকে মেনে নিতে না পারায় এ হত্যার ঘটনা ঘটেছে।’ 

বুলবুলের বড় বোন সোহাগী আক্তারের আহাজারি

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলেকে কোনো ছিনতাইকারী হত্যা করেনি। হত্যার ঘটনা অন্যদিকে নিতে ছিনতাইয়ের কথা বলছে। তাছাড়া ওই মেয়ে যেহেতু ঘটনার সময় উপস্থিত ছিল, সে সব বলতে পারবে। তার চোখের সামনে হত্যার ঘটনা ঘটায় সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে বলে শুনেছি। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাই, আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে তাদের চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।’

সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে (শাবিপ্রবি) সোমবার সন্ধ্যায় বুলবুল নিহত হওয়ার খবর বাড়িতে এলে পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়।

বুলবুলের মা বারবার বলছেন, ‘আমার কলিজার টুকরা, হীরার টুকরারে আইনা দেন, আমি তারে ছাড়া চলব কী করে? সে তো আমার শুধু ছেলে না, আমার বন্ধুও লাগে। আমাদের মা-সন্তানের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। আমি তার কাছে আমার সব দুঃখ কষ্টের কথা বলতাম, সেও বলত।’

নিহত বুলবুল নরসিংদী সদর উপজেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামের মৃত ওহাব মিয়ার ছেলে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে বুলবুল ছিল সবার ছোট। তিনি ২০১৮ সালে নরসিংদীর আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন।

 পুত্রশোকে কাতর মা ইয়াসমিন বেগম।

পরে বুলবুল সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে ভর্তি হন। বর্তমানে তিনি তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহপরান হলের ২১৮ নম্বর কক্ষে থাকতেন।

বুলবুলের বড় বোন সোহাগী আক্তার বলেন, 'আমাদের স্বপ্ন ছিল তাকে বিসিএস ক্যাডার বানাব। পরিবারের হাল ধরবে সে। গত বছরের ডিসেম্বরে স্ট্রোক করে মারা যান বাবা। বাবার মৃত্যুর পর অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে চলছিল পরিবার। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট বুলবুল। সকলের ইচ্ছে ছিল বুলবুল বিসিএস দিয়ে বড় কর্মকর্তা হবে। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল।'

এদিকে মঙ্গলবার রাতে নরসিংদী শহরের ভেলানগর বাসস্ট্যান্ডের পাশে ঈদগাহ মাঠে বুলবুলের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পৌত্রিক ভিটা নরসিংদী সদর উপজেলার মাধবদীর নোয়াকান্দা গ্রামের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

অপর দিকে বুলবুল হত্যার বিচারের দাবিতে বিকেলে শহরের চিনিশপুর নন্দীপাড়ায় তার বাড়ির সামনে মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের পাশে গাজী কালু টিলা-সংলগ্ন ‘নিউজিল্যান্ড’ এলাকায় দুর্বৃত্তরা ছুরিকাঘাত করে বুলবুলকে। মুমূর্ষু অবস্থায় সহপাঠীরা উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।