২০১২ সালের ৯ মে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া ছাত্রলীগের কর্মী ক্লিনটন মজুমদারকে অপহরণের পর হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় করা মামলার এজাহারভুক্ত ৪ নম্বর আসামি আব্দুল্লাহ আল মারজান। গত ২৪ জুলাই ঘোষিত বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পেয়েছেন তিনি। আংশিক কমিটিতে ৩৩ জনের নাম জানানো হয়। তাঁদের মধ্যে মারজান ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন বিতর্কিত নেতার নাম এসেছে। সেই সঙ্গে সহসভাপতি পদে দু'জনের নাম দু'বার করে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন নেতা। এসব নিয়ে সংগঠনের অভ্যন্তরে তোলপাড় তৈরি হয়েছে।
সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কেন্দ্রীয় সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে ৩৩ সদস্যের বরগুনা জেলা কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়। কমিটির সভাপতি হয়েছেন মো. রেজাউল কবির রেজা ও সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন তৌশিকুর রহমান ইমরান। এ ছাড়া সহসভাপতি পদ পেয়েছেন ২০ জন। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ৫ জন ও সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে ৬ জনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
এই কমিটি ঘোষণার পরপরই তা প্রত্যাখ্যান করে বরগুনা শহরে বিক্ষোভ করেছেন পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা। তাঁরা সড়ক অবরোধ করে টায়ারে অগ্নিসংযোগও করেন। সেই সঙ্গে কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়।

ছাত্রলীগের একটি সূত্র জানায়, এক সময় ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন নতুন কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মারজান। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নিকটাত্মীয়ের প্রভাবে সংগঠনের কর্মী না হয়েও নতুন পদ পেয়েছেন তিনি।

পুলিশ জানায়, পিরোজপুরের ছাত্রলীগের কর্মী ক্লিনটন মজুমদার হত্যা মামলা ছাড়াও মারজানের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালের ২২ জুন বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী গ্রামের মো. পান্না মিয়ার বাড়িতে ডাকাতির মামলার ৫ নম্বর আসামি মারজান। এ ছাড়া ২০১৮ সালের ১১ আগস্ট মঠবাড়িয়া থানার সামনে ১৫টি ইয়াবাসহ আটক হন তিনি। এ ঘটনায় ওই থানার এসআই জাফর আহম্মেদ বাদী হয়ে মামলা করেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, আসামি মারজানের বিরুদ্ধে ওই থানায় আরও চারটি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া পাথরঘাটা থানায় মামলা রয়েছে বলেও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। নতুন কমিটির পদ পাওয়ার পর মারজানের মাদক সেবনের ছবি অনলাইনে
ছড়িয়ে পড়েছে।

নিহত ছাত্রলীগের কর্মী ক্লিনটনের বাবা অরূপ মজুমদার বলেন, 'আমার ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে এই মারজান। সে এখন ছাত্রলীগের বড় নেতা। এ বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই। সৃষ্টিকর্তার কাছে বিচার দিলাম।'

এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন আব্দুল্লাহ আল মারজান। তিনি নিজেকে আওয়ামী পরিবারের সন্তান দাবি করে বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাঁকে এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে।

একই কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নাইমুল আহসান রাব্বির বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অভিযোগ। এর মধ্যে পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী বাজারে জমি দখলে জড়িত থাকায় মামলাও রয়েছে। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়া হাসান মো. শাহরিয়ার শুভর বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সেই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি ভাঙচুর করায় তাঁকে আজীবনের জন্যও বহিস্কার করা হয়েছিল।

এ বিষয়ে জেলা ছাত্রলীগের বিদায়ী কমিটির সাধারণ সম্পাদক তানভীর হোসাইন বলেন, 'শুভ পরে সাধারণ ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেছিল। আমরা তা কেন্দ্রে পাঠাই। কিন্তু এখন পর্যন্ত গঠনতান্ত্রিকভাবে তিনি সংগঠনে ফেরেননি।'

আব্দুল্লাহ আল মারজানকে ইউনিয়ন কমিটিতে নেওয়ার বিষয়েই কেন্দ্রীয় নেতাদের মানা ছিল বলেও জানান তানভীর। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, 'এখন কীভাবে তিনি জেলা ছাত্রলীগের কমিটিতে পদ পেয়েছেন, তা আমার বোধগম্য নয়।' হত্যা, ডাকাতি ও মাদক মামলার আসামিকে সংগঠনের পদে দেখতে পেয়ে বিব্রত বোধ করছেন তিনি।

এসব বিষয়ে জানতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের মোবাইল ফোন নম্বরে কল দেওয়া হলে তাঁরা ধরেননি। তবে বরগুনা জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রশিদ রাফি বলেন, 'জেলা কমিটি অনুমোদন দেওয়ার
ক্ষমতা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের। আমি সরেজমিনে যাচাই-বাছাই করে তথ্য দিয়েছি।' তাঁর দেওয়া তালিকায় মারজানের নাম ছিল
না জানিয়ে বলেন, এটি কেন্দ্র থেকে সংযুক্ত করা হয়েছে।

জেলা ছাত্রলীগের সদ্য বিদায়ী সভাপতি জুবায়ের আদনান অনিক বলেন, প্রাণের সংগঠন ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নেতাদের বিরুদ্ধে এত অপকর্মের অভিযোগ থাকা লজ্জাজনক। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখার জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

নতুন কমিটির পদবঞ্চিত মো. রুবেল অভিযোগ করেন, ত্যাগী নেতাকর্মীদের কমিটিতে জায়গা হয়নি। অথচ একাধিক মামলার আসামি, কার্যক্রমে অংশ নেন না, বরগুনার বাইরে থাকেন- এমন অনেকে নেতৃত্ব পেয়েছেন। কমিটি গঠনের আগে যে জীবনবৃত্তান্ত নেওয়া হয়েছে, তা বিবেচনায় আনা হয়নি।

এ বিষয়ে সভাপতি মো. রেজাউল কবির রেজা বলেন, নতুন কমিটি কেবল দায়িত্ব নিয়েছে। দ্রুতই সভা ডেকে মারজানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সহসভাপতি পদে রাইয়ানুল ইসলাম ও রায়হানুল ইসলাম শাওনের বিষয়ে তিনি বলেন, এ দু'জন একই ব্যক্তি কিনা তিনি নিশ্চিত নন। আর আওলাদ হোসেন রাজু বরগুনায় থাকেন ও আওলাদ হোসেন রাজীব ঢাকায় থাকেন।

বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এ বিষয়ে বলেন, 'ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অপরাধের বিষয়টি আমার জানা নেই। এমন কেউ কমিটিতে থাকলে তাঁদের বাদ দেওয়া হবে।'