পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরুর পর ঢাকা-বরিশাল নৌ এবং আকাশপথে তীব্র যাত্রী সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে ঢাকা-বরিশাল আকাশপথে চলাচলকারী নভোএয়ার আগামী ১ আগস্ট থেকে এই রুটে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।

নভোএয়ারের মার্কেটিং অ্যান্ড মিডিয়া কমিউনিকেশনের সহকারী ব্যবস্থাপক নিলাদ্রী মহারত্ন সমকালকে বলেন, ১ আগস্ট থেকে আপাতত ঢাকা-বরিশালে নভোএয়ারের ফ্লাইট চলাচল স্থগিত থাকবে। তবে যাত্রী বাড়লে আবারও ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করা হবে। পরিস্থিতি বুঝে কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।

এদিকে গত মঙ্গলবার থেকে ঢাকা-বরিশাল নৌপথে দিনে চলাচলকারী দ্রুতগামী নৌযান এমভি গ্রিনলাইনের যাত্রী পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গ্রিনলাইন কর্তৃপক্ষ গত সোমবার রাতে নিজস্ব ফেসবুক পেজে এ-সংক্রান্ত ঘোষণা দেয়। তারা বলেছে, পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা-বরিশাল নৌপথে যাত্রী কমে গেছে। মূলত এ কারণেই ঢাকা-বরিশাল ভায়া হিজলা নৌপথে গ্রিনলাইনের সার্ভিস বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে ঢাকা-কালীগঞ্জ-ইলিশা (ভোলা) রুটে এমভি গ্রিনলাইন-২ নিয়মিত চলাচল করবে।
বরিশাল বিমানবন্দরের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরুর পর বরিশাল-ঢাকা আকাশপথে আশঙ্কাজনকভাবে যাত্রী হ্রাস পায়। এতে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়ে এই রুটের যাত্রী সেবাদানকারী বেসরকারি বিমান সংস্থা নভোএয়ার ও ইউএস-বাংলা। যাত্রী ধরে রাখতে বেসরকারি এই দুই বিমান সংস্থা ঈদুল আজহার পর বরিশাল-ঢাকা আকাশ পথে ভাড়া কমিয়ে দেয়। ইউএস-বাংলা প্রতি আসনে যাত্রী ভাড়া ৪ হাজার ৫০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৩ হাজার ৫০০ টাকা করে। নভোএয়ার ৪ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে আসনপ্রতি যাত্রী ভাড়া করে ৩ হাজার ৪৯৯ টাকা। পাশাপাশি বাংলাদেশ বিমানও এ রুটে ২০০ টাকা যাত্রীপ্রতি ভাড়া কমায়। কিন্তু ভাড়া কমিয়ে অপারেশন খরচ তুলতে পারছে না নভোএয়ার। ফলে তারা ১ আগস্ট থেকে ফ্লাইট পরিচালনা না করার সিদ্ধান্ত নেয়।

ইউএস-বাংলার বরিশাল সেলস অফিসের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এখন ঢাকা-বরিশাল আকাশপথে তাদের ৭০ আসনের জাহাজ যাত্রী পরিবহন করছে। সেতু চালু হওয়ার পর প্রায়ই তাদের প্রতিটি ফ্লাইটে এক-তৃতীয়াংশ আসন ফাঁকা যাচ্ছে। এ অবস্থায় ইউএস-বাংলা কতদিন ঢাকা-বরিশাল আকাশপথে যাত্রীসেবা দিতে পারবে তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
বাংলাদেশ বিমানের বরিশাল স্টেশন ব্যবস্থাপক মো. শওকত আলী খান বলেন, সেতু চালুর পর সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়া এবং খরচ কমে যাওয়ায় আকাশপথে যাত্রী কমেছে। গত শনিবার থেকে বাংলাদেশ বিমানের ভাড়া ৩২০০ টাকার স্থলে নেওয়া হচ্ছে ৩০০০ টাকা।

পদ্মা সেতু চালু হলে ঢাকা-বরিশাল নৌপথেও যাত্রী কমবে এমন গুঞ্জন ছিল সর্বমহলে। শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। সেতু চালুর পর নৌপথে তীব্র যাত্রী সংকটের কারণে মঙ্গলবার থেকে দ্রুতগামী জলযান এমভি গ্রিনলাইনের দিবা সার্ভিস বন্ধ হয়ে গেছে। ২০১৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা-বরিশাল ভায়া হিজলা নৌপথে স্বল্প সময়ে দিনে যাত্রীসেবা দিয়ে আসছিল গ্রিনলাইন ওয়াটার ওয়েজ। মাত্র ৫ ঘণ্টায় উভয় প্রান্ত থেকে (ঢাকা ও বরিশাল) যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিত গ্রিনলাইন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাত্রী সংকটে তারা সার্ভিস বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।

এদিকে রাত্রিকালীন নৌযান মালিকরাও আছেন দুশ্চিন্তায়। আগে বরিশালের সর্বস্তরের যাত্রীরা নিরাপদ ও আরামদায়ক হিসেবে লঞ্চেই ঢাকা এবং বরিশালে যাতায়াত করতেন। কিন্তু সেতু চালুর পর যাত্রীরা লঞ্চবিমুখ হয়ে সড়কপথে যাতায়াতের দিকে ঝুঁকেছেন। এতে যাত্রী সংকটে পড়ে সেতু চালুর পরদিন অর্থাৎ ২৬ জুন থেকেই লঞ্চ মালিকরা যাত্রী ধরে রাখতে ভাড়া কমিয়ে দেন। তবে ঈদুল আজহার সময় যাত্রীর চাপ বেড়ে গেলে আবার ভাড়া বাড়ান লঞ্চ মালিকরা। তবে ঈদে বাড়িফেরা এবং কর্মস্থলমুখী যাত্রীর চাপ কমে যাওয়ার পর আবার নৌপথে যাত্রী কমে যায়। এ কারণে আবারও কমানো হয়েছে লঞ্চের ভাড়া।

ঢাকা-বরিশাল নৌপথে চলাচলকারী সুন্দরবন লঞ্চের স্বত্বাধিকারী সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, ঈদুল আজহার পর আবার যাত্রী কমে গেছে। আমরা লঞ্চ মালিকরা খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে আছি। সুরভী লঞ্চ কোম্পানির পরিচালক মো. রিয়াজ উল কবির বলেন, যাত্রী সংকটের কারণে সব লঞ্চের ভাড়া কোরবানির পর কমানো হয়েছে। পদ্মা সেতু নৌযান মালিকদের বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

সেতু চালুর পর বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চল থেকে সড়কপথে যাত্রীর চাপ ২-৩ গুণ বেড়ে যায়। বরিশাল তথা দক্ষিণের ৬ জেলার সড়ক রুটগুলোয় নতুন নতুন পরিবহন যুক্ত হচ্ছে।


বিষয় : বন্ধ হচ্ছে নভোএয়ারের ফ্লাইট বরিশাল বিমান বন্দর

মন্তব্য করুন