বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে কমেনি বাঘের পরিবেশের হুমকি। বিভিন্ন ধরনের দূষণ, বৃক্ষনিধন, অপরিকল্পিত পর্যটন, পিটিয়ে বাঘ হত্যা ও শিকার বন্ধ হয়নি। মানুষের এসব আগ্রাসনের পাশাপাশি আছে প্রাকৃতিক হুমকিও; অসুস্থতা, নানা দুর্যোগ ও বার্ধক্যজনিত কারণেও মারা যাচ্ছে এই প্রাণী। তিন বছরে এদের ৬টি মৃতদেহ ও দুটি চামড়া উদ্ধার হয়েছে।

এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জোয়ারের সময় নোনাপানিতে বনভূমি ডোবা বেড়ে যাওয়ায় কমেছে বিচরণক্ষেত্র, পাচ্ছে না পানযোগ্য মিষ্টিপানিও। এদিকে আগামী নভেম্বর থেকে বাঘ ও বাঘের শিকার প্রাণীর অবস্থা জানতে শুমারি করার কথা থাকলেও অর্থ বরাদ্দ না মেলায় তা সম্ভব হচ্ছে না।

জানা গেছে, সুন্দরবনের পাশে গড়ে তোলা শতাধিক ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বনের মধ্য দিয়ে চলাচল করা জাহাজের বিভিন্ন মাত্রার দূষণ বাঘের ক্ষতি করছে। বন উজাড়, বন্যপ্রাণীর খাদ্যসংকট, বিষ দিয়ে মাছ নিধন এবং পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরা ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণেও সরাসরি বিরূপ প্রভাব পড়ছে এই প্রাণীর স্বাধীন বিচরণ ও বংশবিস্তারে। এ ছাড়াও খাদ্য আহরণে লোকালয়ে চলে আসায় পিটিয়ে হত্যার পাশাপাশি ঘটছে পাচারের উদ্দেশ্যে বাঘ শিকারের ঘটনা।

এরই মধ্যে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আজ শুক্রবার পালন করা হচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস। কর্মসূচির মধ্যে সকাল ১০টায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বন ভবনে আলোচনা সভা উল্লেখযোগ্য। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিন প্রধান অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী সমকালকে বলেন, বনের পার্শ্ববর্তী এলাকায় গ্যাস, জ্বালানি তেল, সিমেন্ট ফ্যাক্টরিসহ বিভিন্ন প্রকারের বহু শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানার তরল বর্জ্য পশুর নদে ফেলা হচ্ছে। জোয়ার-ভাটায় এই বর্জ্য বনের মাটিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এতেই বাঘের পরিবেশ চরমভাবে হুমকিতে পড়েছে। তার ওপর সংশ্লিষ্ট এলাকায় আরও শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে। এ ছাড়া বনের ভেতর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের বর্জ্য ও তেল বনের পানি-মাটিতে দূষণ ঘটাচ্ছে, জাহাজের আলো ও শব্দের কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাঘসহ অন্যান্য প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাপন।

সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, বাঘের হুমকিগুলো আগের মতোই আছে। কমেনি, বরং দিন দিন বাড়ছে। গণপিটুনিতে বাঘ হত্যা, শিকার ছাড়াও ঘটছে এই প্রাণীর প্রধান খাবার হরিণ শিকারের ঘটনা। বাঘের সুরক্ষায় বনের ভেতর দিয়ে উচ্চ শব্দে গানবাজনাসহ বিভিন্ন জলযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবীর জানান, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস এবং নিম্নচাপ ও অমাবস্যা-পূর্ণিমার প্রভাবে মাঝেমধ্যে অস্বাভাবিক জোয়ারে সুন্দরবনের বনভূমি প্লাবিত হয়। এ সময় আশ্রয়স্থল না থাকায় হুমকির মুখে পড়ে বাঘসহ অন্য প্রাণীগুলো।

এদিকে গত ২৩ মার্চ প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষ 'সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের' অনুমোদন করা হয়। প্রকল্পের আওতায় লোকালয়ে চলে আসা ঠেকাতে নাইলনের ফেন্সিং, প্রজনন বাড়াতে বাঘ স্থানান্তর ছাড়াও ৩ কোটি ২৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকা ব্যয়ে ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে আগামী নভেম্বর থেকে সুন্দরবনে বাঘ এবং বাঘের শিকার প্রাণী হরিণ ও শূকরশুমারি করার কথা ছিল।

তবে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ বরাদ্দ মেলেনি। সে কারণে কেনা সম্ভব হয়নি বিশেষ ক্যাটাগরির ২০০টি ক্যামেরা, ক্যামেরার ব্যাটারি ও এসডি কার্ড। সম্ভব হয়নি পরামর্শক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণও। এ কারণে চলতি বছর বাঘশুমারি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

২০১৩ সালে সুন্দরবনে ১০৬টি বাঘ শনাক্ত হয়। ২০১৮ সালের শুমারিতে দেখা যায়, এই সংখ্যা বেড়ে ১১৪ হয়েছে। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মো. মহসিন হোসেন বলেন, তিন বছর পরপর বাঘশুমারির কথা থাকলেও সর্বশেষ শুমারি হয়েছে ২০১৮ সালে। এ বছরও করা যাবে কিনা তা নির্ভর করছে অর্থ বরাদ্দের ওপর।

খুলনা সার্কেলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো বলেন, বাঘ রক্ষাসহ সংখ্যা বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বন্যপ্রাণী শিকার প্রতিরোধে সুন্দরবনে জিপিএসের সাহায্যে 'স্মার্ট প্যাট্রলিং' চলছে। এর বাইরে বন বিভাগ, পুলিশ, র‌্যাব ও কোস্টগার্ড বাঘ শিকার প্রতিরোধে কাজ করছে। লোকালয়ে আসা বাঘ রক্ষায় সুন্দরবনসংলগ্ন গ্রামগুলোতে ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম আছে।