জেলা শহর থেকে দুই কিলোমিটার দূরের শহরতলি যশোদলে ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক স্থাপত্যে নির্মিত হয়েছে 'কিশোরগঞ্জ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল'। জনগণের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি সমৃদ্ধ করা হয়েছে আধুনিক যন্ত্রপাতিতে। তবে চালু হওয়ার দুই বছরেই প্রান্তিক মানুষের এই ভরসার স্থানকে ঢেকে ফেলেছে অনিয়মের কালো ছায়া। সুসজ্জিত ভবন থাকলেও সেবার নামে আছে কমিশনের ব্যবসা। অর্থের লোভে রোগীদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও অস্ত্রোপচারের জন্য আশপাশে গজিয়ে ওঠা নামসর্বস্ব ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে বাধ্য করা হয়। বিনামূল্যে দেওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ ওষুধ ফার্মেসি থেকেই কিনতে হয়।

হাসপাতালের নামে এটি এখন একটি ফাঁদে পরিণত হয়েছে। জানা গেছে, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের একাধিক সভায় আশপাশে (১০০০ গজের মধ্যে) বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও প্যাথলজি ল্যাবরেটরি স্থাপন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে রহস্যজনক কারণে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয় না। হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী থেকে শুরু করে চিকিৎসক- সবাই জড়িয়েছেন কমিশনের ব্যবসায়। তাঁদের সহযোগিতায় দ্রুতই গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও প্যাথলজি ল্যাবরেটরি। তাঁদের প্রতিনিধিরা হাসপাতাল দাপিয়ে বেড়ান গুরুত্বপূর্ণ পদের স্বাস্থ্যকর্মীর মতো। এই দালালদের সঙ্গে আঁতাত করে নানা অজুহাত দেখিয়ে রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠানো হয়।

সদর উপজেলার রশিদাবাদ গ্রামের আমেনা বেগম জানান, চিকিৎসক তাঁকে পেটের চিকিৎসার জন্য আলট্রাসনোগ্রাম করতে বলেন। তিনি হাসপাতালে আলট্রাসনোগ্রাম করতে গেলে এক কর্মচারী তাঁকে বলেন, এখানে আলট্রাসনোগ্রাম করলে রিপোর্ট অস্পষ্ট আসবে। বাইরের একটি বেসরকারি প্যাথলজি ল্যাবরেটরির নাম জানিয়ে বলেন, সেখানে পরীক্ষা করলে রিপোর্ট স্পষ্ট আসবে। এতে ভালো চিকিৎসা নিশ্চিত হবে। পরে বাইরের একটি ক্লিনিকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে আলট্রাসনোগ্রামসহ অন্য পরীক্ষাগুলো করতে বাধ্য হই। এ পরিস্থিতিতে শুধু আমি নই, অধিকাংশ রোগীকেই পড়তে হচ্ছে।

হাসপাতালে ভর্তি সোমরাজ, আফজল, আদিলুজ্জামানসহ অর্ধশতাধিক রোগী অভিযোগ করেন, তাঁদের অধিকাংশ প্যাথলজি পরীক্ষা বাইরে থেকে করতে বাধ্য করা হচ্ছে, বিশেষ করে যে পরীক্ষাগুলো ব্যয়বহুল। দামি ওষুধগুলোও কিনে নিতে হচ্ছে। অনেক সময় নার্সরা টাকা না দিলে কথা শুনতে চান না। রোগীদের স্বজনরা বলেন, সরকারি মেডিকেল কলেজের এই অবস্থা দেখে আমরা বিভ্রান্ত ও বিস্মিত। জনগণের টাকায় কেনা হাসপাতালের দামি দামি মেশিন তাহলে কী কাজে ব্যবহার করা হয়? এগুলো পরীক্ষার উপযোগী না হলে চেহারা দেখার জন্য কেনার কী দরকার ছিল? তাহলে বাইরে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে লিখে দেওয়া হোক যে এখানে কোনো পরীক্ষা করা হয় না!

হাসপাতালের পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, এখানে ভর্তি হওয়া রোগীদের পরীক্ষার জন্য বাইরের প্রতিষ্ঠানে না পাঠাতে এবং অন্য কোনো ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে প্রেসক্রিপশন না করতে চিকিৎসকদের নির্দেশনা দেওয়া আছে। এই নির্দেশনা অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সাইফুল ইসলাম ও হাজেরা বেগম বলেন, 'দালালদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ নেই। টাকার বিনিময়ে এসব অপকর্ম আমরা করি না। তবে যেসব প্যাথলজির রিপোর্ট অস্পষ্ট আসে, সেগুলোর পরীক্ষা বাইরে থেকে করাতে বলা হয়।' মেশিনে ত্রুটির কারণে রিপোর্ট অস্পষ্ট আসার বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কেন জানানো হয়নি- এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান এ দুই কর্মচারী।

হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক রোগী জানান, পারভেজ আহমেদ নামের এক চিকিৎসক প্রতিদিন সন্ধ্যার পর মেডিকেল অফিসার হিসেবে ওয়ার্ডে আসেন। তিনি যে কোনো পরীক্ষার জন্য রোগীদের হাসপাতালের পার্শ্ববর্তী বেসরকারি রেডিয়াম ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে বলেন এবং নিয়মিত সেই রিপোর্ট দেখে প্রেসক্রিপশন লিখছেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. পারভেজ বলেন, অন্য চিকিৎসকরা বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য রোগীদের বাইরের ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠাতে পারেন। আমি এসবে উৎসাহ দিই না।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) জেলার সাধারণ সম্পাদক ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওয়াহাব বাদল বলেন, শুরু থেকেই আমরা দাবি জানিয়ে আসছি, হাসপাতালের আশপাশে কোনো বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যাবে না। এর পরও যত্রতত্র গজিয়ে উঠছে এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। তবে এদের মূল ভরসা হাসপাতালের নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। তাঁরা কমিশনের আশায় রোগীদের বাইরে পরীক্ষা করানোর জন্য বাধ্য করে থাকেন।

বিএমএ জেলা সভাপতি ডা. মাহবুব ইকবাল বলেন, এই হাসপাতালসহ দেশের সব সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রোগীরা নানা অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদের বিনামূল্যের ওষুধগুলো না দিয়ে বাইরে বিক্রির অভিযোগ আছে; অধিকাংশ সময় নানা অজুহাতে ব্যয়বহুল পরীক্ষাগুলো বাইরের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে করতে বাধ্য করা হয়। আমাদের সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা হলেও অসাধু চিকিৎসক ও কর্মচারীদের লোভের কারণে বঞ্চিত হন রোগীরা।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ জেলা কমিটির সভাপতি ডা. দীন মোহাম্মদ বলেন, হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সভায় আশপাশে কোনো ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার না করতে দেওয়ার বিষয়ে প্রস্তাব করলে সবাই তা সমর্থন করেন। এর পরও এই হাসপাতাল একটি ফাঁদে পরিণত হয়েছে। সরকারি ভেবে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ সেবা নিতে এসে নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কমিশনের লোভের শিকার হন।

সচেতন নাগরিক কমিটির সহসভাপতি সহযোগী অধ্যাপক রওশন আরা লুৎফুন্নেছা বলেন, হাসপাতালের আশপাশে যেসব বেসরকারি প্যাথলজি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে, সেগুলোতে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতারা জড়িত। তাঁরা হাসপাতালের উন্নত যন্ত্রপাতি নষ্ট করার ক্ষমতাও রাখেন। তাঁদের কমিশনের লোভে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী যন্ত্রপাতি বিকল দেখিয়ে রোগীদের বাইরে পরীক্ষার জন্য পাঠান। তাঁদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে; বাড়াতে হবে ঊর্ধ্বতনদের নজরদারি।