'ভোট দিয়ে বাড়িতে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আসার পথে এমন ঘটনা। রাস্তায় কাঁদানে গ্যাস আর ফাঁকে ফাঁকে পুলিশ ছাড়া কোনো কিছু দেখা যাচ্ছিল না। ওই সময় জহিরুলের বাড়ির সামনে ছিলাম। সুরাইয়া কোলে ছিল। হঠাৎ বিকট শব্দে কোল থেকে সুরাইয়া বাতাসের গতিতে উড়ে যায়। আমিও পড়ে যাই। এরপর আর কিছু বলতে পারি না। পরে জানতে পারি, আমার মা সুরাইয়া আর নেই। কী অপরাধ ছিল আমার মেয়ের? গরিব মানুষ কোনো বিচারও পাব না। মেয়েকে হারাতে হবে জানলে ভোট দিতেও যেতাম না।' আর্তনাদ করে এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত শিশু সুরাইয়ার মা মিনারা বেগম।

নির্বাচনী সহিংসতায় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় বৃহস্পতিবার দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে ওই কমিটি করা হয়।

এদিকে শিশুটির বাবা বাদশা মিয়া বলেন, 'মেয়ে হারানোর শোক ক্যামনে সইবো। ঝালমুড়ির দোকান করতাম। অসুস্থ থাকার কারণে সেটিও বন্ধ। অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চলে। বসতভিটা নেই, সরকারি গুচ্ছগ্রামে বসবাস করি।'

বৃহস্পতিবার মৌলভীবাজারে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, সেখানে দুই পক্ষের নির্বাচনী সহিংসতার সময় এক শিশু মায়ের কোলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। এতে পুলিশের ব্যর্থতা থাকলে তদন্ত করে আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বুধবার ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলের বাচোর ইউনিয়নের ভিএফ বালিকা বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ভোটের ফলাফল দেখতে শিশুটিকে কোলে নিয়ে ওই কেন্দ্রের সামনে ছিলেন তার মা। ফলাফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুলিশ গুলি ছোড়ে। একটি গুলি ওই শিশুর মাথায় লাগে। এতে ঘটনাস্থলেই শিশুটির মৃত্যু হয়।

বাদশা মিয়া নন্দুয়ার ইউনিয়নের মিরডাঙ্গী দিঘীপাড়া সরকারি গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা হলেও বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে বাচোর ইউনিয়নের ভোটার। বাড়ির পাশে পুকুর, সে কারণে স্ত্রী মিনারা কোলের শিশুকে বাড়িতে রেখে যাওয়ার ভরসা পাননি। ছোট্ট শিশু সুরাইয়াকে নিয়ে গিয়েছিলেন স্বামী বাদশাকে বাড়িতে আনতে। ভোটের ফলাফল শোনার লোভে পড়ে সেখানেই আটকে যান মিনারা। শেষে মেয়েকে হারিয়ে নিজেকেও ভর্তি হতে হয় হাসপাতালে। মেয়ের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর বাদশা ও মিনারা দু'জনেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তাঁরা বৃহস্পতিবার বিকেলে বাড়ি ফেরেন।

রানীশংকৈল থানার ওসি এসএম জাহিদ ইকবাল বলেন, এ ঘটনার তদন্ত চলছে। এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। নিহত শিশুর মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে শিশুটির দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

এ ঘটনায় ওই রাতেই রানীশংকৈল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মাহবুবুর রহমান ও পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর হোসেন নিহত সুরাইয়ার বাবা-মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা প্রদান করেন।

বুধবার রাতে ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার বাচোর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে হেরে যাওয়া মেম্বার প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরদের পথরোধ করে স্থানীয়রা। অভিযোগ উঠেছে, ওই সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি চালালে শিশু সুরাইয়ার মাথার খুলি উড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় সুরাইয়ার। এই ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ স্বজন-স্থানীয়রা মরদেহ পুলিশের গাড়ির সামনে ফেলে রেখে পথরোধ করেন। এ সময় গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। পরে পুলিশ এসে বিক্ষুব্ধ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বর্তমানে অনেকে পুলিশের ভয়ে এলাকাছাড়া।

ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মাহবুবুর রহমান বলেন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রাম কৃষ্ণ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজিয়া সুলতানা ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা নুরে আলমকে নিয়ে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবে। তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পুলিশ সদরদপ্তরের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, কেন, কী প্রেক্ষাপটে গুলি করার প্রয়োজন হলো, তা তদন্ত কমিটি খুঁজে বের করবে।