সরকারি বিধি অনুযায়ী চাকরিপ্রার্থীর বয়স ৩০ পেরিয়ে গেলে আবেদনের অযোগ্য হিসেবে গণ্য হতে হয়। তবে কাগজে-কলমে এমন কঠোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও চাকরির বয়সসীমা ১০ মাস ১৭ দিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও চাকরিতে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি। এ জন্য নিয়েছেন জালিয়াতির আশ্রয়। তিনি তাকবীর হোসেন। বয়স জালিয়াতি করে এখনও বহাল তবিয়তে আছেন। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ব্লাড ব্যাংকে অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে কর্মরত।

সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতালে রক্ত পাচার, নিয়োগ পরীক্ষায় খাতা কাটাকাটি করে অতিরিক্ত নম্বর পাইয়ে দেওয়াসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তাকবীরের বিরুদ্ধে। চিকিৎসক নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়েই তাকবীর এমন বেপরোয়া হয়েছেন বলে মনে করেন হাসপাতালের সংশ্নিষ্টরা। তাঁর বয়স জালিয়াতির এমন ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে হাসপাতালে। তদন্তে মাঠে নেমেছে দুদক। নানা মহলের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কমিটিও গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

জানা যায়, চমেক হাসপাতালের নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রাম নামের একটি প্রকল্পে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন তাকবীর হোসেন। তবে এই এনজিও কার্যক্রমকে সরকারি চাকরি দেখিয়ে বিভাগীয় প্রার্থী হিসেবে চমেক হাসপাতালে চাকরির জন্য আবেদন করেন তিনি।

তাঁর জন্মতারিখ ১৯৮০ সালের ১ অক্টোবর। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী ১৮-০৮-২০১১ ইংরেজি তারিখে তাকবীর হোসেনের বয়স ছিল ৩০ বছর ১০ মাস ১৭ দিন। অর্থাৎ চাকরির আবেদনের তারিখ পর্যন্ত তাঁর বয়স ১০ মাস ১৭ দিন বেশি ছিল। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ৯নং শর্ত অনুযায়ী সরকারি চাকরিরত প্রার্থীদের বয়স শিথিলযোগ্য উল্লেখ ছিল। সে সময় তিনি এনজিওর প্রকল্পের অধীনে কর্মরত ছিলেন। তাঁর প্রথম সরকারি চাকরিতে যোগদানের তারিখ ছিল ২০১১ সালের ২৮ ডিসেম্বর। বিভাগীয় প্রার্থী হিসেবে চাকরির জন্য আবেদন করারই কোনো সুযোগ ছিল না তাকবীরের। অথচ বয়সসীমা পার হওয়ার পরও বিভাগীয় প্রার্থী দেখিয়ে চাকরি বাগিয়ে নেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, এ জন্য হাসপাতালের পরিচালক কার্যালয়ের কাগজপত্র জালিয়াতি করা হয়েছে। পরিচালকের প্যাড ব্যবহার করে তাকবীর হোসেনকে বিভাগীয় প্রার্থী হিসেবে জমা দেওয়া প্রত্যয়নপত্রে পরিচালকের কোনো স্বাক্ষরও ছিল না। তাকবীরের ওপর এক চিকিৎসক নেতার আশীর্বাদ থাকার কথাও বলছেন হাসপাতালের অনেকেই। তাছাড়া বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা ডা. আবুল হোসেন তাকবীর হোসেনের আপন ভাই বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান সমকালকে বলেন, তাকবীর হোসেনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ পেয়েছি। বয়স জালিয়াতিসহ যাবতীয় বিষয়ের সঠিক তথ্য উদ্ঘাটন করতে একটি কমিটি গঠন করেছি। কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান চমেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. রাজীব পালিত সমকালকে বলেন, বয়স জালিয়াতিসহ তাকবীর হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগের আমরা তদন্ত করছি। এ জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। নেওয়া হচ্ছে সংশ্নিষ্টদের বক্তব্যও। অনিয়ম-কারসাজিতে তাকবীরের সঙ্গে আর কেউ জড়িত আছে কিনা সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শিগগির প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।

দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, তাকবীর হোসেনের নেতৃত্বে ব্লাড ব্যাংকে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ পেয়েছি আমরা। বাড়তি টাকার বিনিময়ে সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতালে রক্ত পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে। যাবতীয় অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে তাকবীর হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ ওঠার পর থেকেই তাঁর কাছে থাকা দুটি মোবাইলই বন্ধ রেখেছেন তিনি।