খুলনার কয়রায় সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় অবৈধভাবে ২০টি করাতকল চলছে। এসব মেশিনের চাকা দিনে তেমন চালু না থাকলেও সক্রিয় হয় রাতে। বনের পাচার হওয়া কাঠ চিরতে বিরাজ করে উৎসবের আমেজ। এতে উজাড় হচ্ছে পরিবেশেবন্ধু গাছ, শব্দ ও কাঠের গুঁড়ায় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ-বায়ু। আলো না জ্বালিয়েই করাতকলের কার্যক্রম চালাতে গিয়ে ঘটছে দুর্ঘটনা। নানাভাবে ভুগতে হচ্ছে আশপাশের বাসিন্দাদের।

সম্প্রতি রাতে সুন্দরবনের চোরাই কাঠ কাটতে গিয়ে মিলের করাতে তিনটি আঙুল কাটা পড়েছে এক শ্রমিকের। সমকালকে তিনি জানান, উপজেলা সদরের দেউলিয়া বাজারের একটি করাতকলে মাসিক বেতনে কাজ করেন তিনি। সেই রাতে সুন্দরবন থেকে কাঠ নিয়ে আসে পাচারকারীরা। অনেক কাঠ তড়িঘড়ি কাটতে গিয়ে তিনটি আঙুল কাটা পড়ে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই শ্রমিক অভিযোগ করেন, মিলমালিকরা বেশি লাভের আশায় সুন্দরবনের অবৈধ কাঠ কাটতে বাধ্য করেন তাঁদের। উপজেলার সবক'টি মিলেই সুন্দরবনের কাঠ চেরাই হয়। রাতে কাজ করলে মজুরিও বেশি দেওয়া হয়।

করাতকলের নিবন্ধন বিধি অনুযায়ী, সংরক্ষিত, রক্ষিত, অর্পিত বা অন্য যে কোনো ধরনের সরকারি বনভূমির সীমানার ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপন করা যাবে না। একই সঙ্গে কোনো সরকারি কার্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিনোদন পার্ক, উদ্যান এবং জনস্বাস্থ্য বা পরিবেশের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে- এমন কোনো স্থানের কমপক্ষে ২০০ মিটারের মধ্যে করাতকল পরিচালনা করা যাবে না। এসব বিধির তোয়াক্কা না করেই সুন্দরবন ঘিরে একের পর এক করাতকল গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে সুন্দরবনের অধিকাংশ কাঠ চেরাই কার্যক্রম চলছে।

অন্তত ২০টি অবৈধ করাতকল সুন্দরবনের পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটারের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে দেউলিয়া বাজারে পাঁচটি, বগা বাজারে দুটি ও মেঘারাইট গ্রামের কপোতাক্ষ তীরে দুটি, উপজেলা সদরের বাসস্ট্যান্ড মোড়ে তিনটি, শুড়িখালি বাজারের পাশে তিনটি, আমাদি বাজারে একটি, ঘুগরাকাটি বাজারে তিনটি ও গোবিন্দপুর মুচিখালি বাজারে একটি করাতকল আছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, করাতকলগুলো দিনের চেয়ে রাতে সচল থাকে বেশি। ভোর হওয়ার আগে এসব করাতকল থেকে সুন্দরবনের কাঠ চেরাই করে ভ্যান ও ট্রলারভর্তি করে নিয়ে যায় পাচারকারীরা। তা ছাড়া দিন ও রাতে করাতকলগুলো সচল থাকায় আশপাশের বসতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ছেয়ে যায় কাঠের গুঁড়ায়।

স্থানীয় করাতকল মালিক সমিতির নেতা মাকসুদুর রহমান বলেন, সব করাতকলে সুন্দরবনের কাঠ চেরাই হয়, এটা ঠিক নয়। নদীতীরের দু-একটিতে অবৈধ কার্যক্রম হয় বলে শুনেছি। তবে তাদের সতর্ক করা হয়েছে। তা ছাড়া করাতকলের লাইসেন্স নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান আছে।

সামাজিক সংগঠন ইনেশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আশিকুজ্জামান আশিক বলেন, সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা করাতকলগুলো বনের জন্য হুমকি। এসব কলে মানুষের প্রয়োজনীয় কাঠের চেয়ে বনের চোরাই কাঠ চেরাই হচ্ছে বেশি। অবিলম্বে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে বন গিলে ফেলবে।

উপজেলা সামাজিক বন বিভাগের কর্মকর্তা প্রেমানন্দ রায় বলেন, কয়রার সব করাতকল অবৈধ। এগুলো সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। কলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসনকে লিখিতভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। কয়রার ইউএনও অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, অবৈধ করাতকলগুলো বন্ধ করতে সামাজিক বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে।