মারধরের পর স্বামীকে ফেলে দিয়ে চলন্ত বাসে পোশাককর্মীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় আবার আলোচনায় তাকওয়া পরিবহন। তবে তাদের জন্য ধর্ষণের ঘটনা এই প্রথম নয়। ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর রাতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের ভান্নারা এলাকায় তাকওয়ার চলন্ত বাসে চকলেট বিক্রেতা এক কিশোরীকে ধর্ষণ করে চালক সাদ্দাম হোসেন। পরে তাকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।

ধর্ষণের ঘটনা ছাড়াও তাকওয়া পরিবহনকে গাজীপুরে 'মরণযান' বলা হয়। এ পরিবহনের বাসের স্টাফদের বিরুদ্ধে রয়েছে ধাক্কা দিয়ে যাত্রী ফেলে পিষে হত্যার রেকর্ড। দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে তাকওয়ার চালকরা। গত ৭ জুলাই গাজীপুর শহরের শিববাড়ি এলাকায় ভাড়া নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডার জেরে তাকওয়ার বাস থেকে মো. সায়েম নামে এক যাত্রীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় হেলপার। পরে চালক তাঁকে পিষে মেরে পালিয়ে যায়। আর গত ১৪ জুলাই শ্রীপুরে তাকওয়া বাসের চাপায় মারা যান তাসলিমা আক্তার নামে এক পোশাক শ্রমিক।

সংশ্নিষ্টরা জানান, গাজীপুরে ছয়টি মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কের জন্য তাকওয়া পরিবহনের ৩০৬টি বাস রয়েছে। শিল্প অধ্যুষিত এই জেলায় লক্কড়ঝক্কড় এসব গাড়িই শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের ভরসা। অথচ তাকওয়ার চালক ও সহকারীরা প্রতিনিয়ত যাত্রীদের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করে। একটু তর্কেই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। হরহামেশা করে নারীদের শ্নীলতাহানি। জেলার নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তাকওয়া পরিবহন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে 'অদৃশ্য' কারণে সে সিদ্ধান্ত আর বাস্তবায়িত হয়নি।

তাকওয়া বাসের অদক্ষ চালকরা কত মানুষের প্রাণ যে কেড়ে নিয়েছে; কতজন আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তার কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে গত এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে গাজীপুরে পরপর তিন নারী-পুরুষের মৃত্যু হয় তাকওয়া বাসের চাপায়। আহত হন অন্তত আটজন।

এরপর তাকওয়া পরিবহন বন্ধের দাবিতে গত ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সামনে আন্দোলন করেন অন্তত ১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। আর বাস থেকে ফেলে চাকায় পিষে সায়েমকে হত্যার পর গত ১ আগস্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে তাকওয়া পরিবহন বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন নিহতের স্বজনরা।

এভাবে প্রতিনিয়ত তাকওয়া পরিবহনের বাসে প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ। বাসটি বন্ধের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে হাজারো মানুষ মতামত দিয়েছেন। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে বন্ধ হচ্ছে না তাকওয়া পরিবহন। সর্বশেষ শনিবার সকালে বাসের ভেতরে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় পুনরায় জোর দাবি উঠেছে তাকওয়া পরিবহন বন্ধের।

চালক ও হেলপাররা জানায়, তাকওয়া পরিবহনের বাস নিয়ন্ত্রণ করেন গাজীপুর জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি সুলতান আহমেদ সরকার। তিনি বলেন, ৩০৬টি বাস থাকলেও প্রতিদিন সব বাস চলাচল করে না। সব সময় চালক-হেলপারদের সতর্ক করা হয়। সড়ক আইন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। যাত্রীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে, তাও শেখানো হয়। এর পরও দুর্ঘটনা এবং কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। অবশ্য এসব ঘটনার জন্য সাধারণ মানুষের অসাবধানতাকেও দায়ী করেন সুলতান আহমেদ।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ সূত্র জানায়, কাগজপত্র না থাকায় সম্প্রতি বিশেষ অভিযান চালিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাকওয়া পরিবহনের বেশ কয়েকটি বাস ডাম্পিং করা হয়েছে।