‘জন্মের পরপরই বাবাকে হারায় রেখা। মাত্র দুই বছর বয়সে হারায় মাকেও। এতিম মেয়েটাকে আমি লালনপালন করি। আমার স্বামী সামান্য রাজমিস্ত্রির কাজ করত। ঘরেতো অভাব। তাই ২০১২ সালের দিকে আমরা ঢাকায় যাই। এর কয়েকদিন পর মরার শহর আমার রেখাকে কোল থেকে ছিনিয়ে নেয়। আর এইবার আমার বাপ-মা-মরা এতিম মেয়েটাকে চিরতরে গিলে খেল মানুষের লোভ।’

এভাবেই সমকাল প্রতিবেদকের কাছে আক্ষেপ করছিলেন পারভীন বেগম। সম্পর্কে তিনি রেখা বেগমের খালা। তবে স্নেহ-মমতায় এতিম রেখার মায়ের প্রতিচ্ছবি। 

২০ বছর বয়সী রেখার বাড়ি বরগুনা জেলার আমতলীর হলদিয়া ইউনিয়নে টেপুরা গ্রামে। ঢাকার বনানীতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন তিনি। অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর গৃহকর্মীর বাসা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। স্বজনদের অভিযোগ, গৃহকর্তীর নির্যাতনে মারা গেছেন রেখা। রেশমা নামে ওই গৃহকর্তীকে আটক করেছে পুলিশ। 

আজ মঙ্গলবার সকালে স্বজনরা ঢাকা থেকে রেখার মরদেহ নিয়ে গ্রামে আসছেন। মরদেহের অনেক জায়গায় দেখা গেছে আঘাতের চিহ্ন। এতিম রেখার মৃত্যুর খবর পৌঁছাতেই গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। 

রেখার খালা পারভীন বলেন, ‘আমরা যখন ঢাকায় যাই এর কিছুদিন পরই বিমানবন্দর এলাকা থেকে হারিয়ে যায় রেখা। তখন ওর বয়স মাত্র ১০ বছর। অনেক খুঁজেও ওকে আর পাইনি। অনেক বছর বুকটা গোরস্থান হয়ে ছিল। ২০১৯ সালে হঠাৎ একদিন রেখা গ্রামে ফিরে আসে। আমার কলিজায় সেদিন যেন প্রাণ ফিরে আসে।’

পারভীন যখন মুঠোফোনে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলছিলেন তখন তিনি লাশ নিয়ে ঢাকা থেকে রওনা করেছেন। ভেজা কণ্ঠে তিনি জানান, হারিয়ে যাওয়ার পর এক পর্যায়ে রাজধানীর বনানীতে রেশমা বেগম নামে একজনের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করত রেখা। রেশমা ছিলেন তালাকপ্রাপ্তা। রেখার দীর্ঘ ৯ বছরের বেতনের টাকা বাকি পড়েছিল। দিচ্ছি, দেবো করে দিচ্ছিল না। রেখা তখন পালিয়ে গ্রামে চলে আসে। 

রেশমা বলেন, ‘এরপর বকেয়া টাকা দেওয়ার আশ্বাসে রেখাকে আবার ডেকে নেওয়া হয়। কিছুদিন ফোনে যোগাযোগ করত। রেখা তার পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দিচ্ছিল মালিককে। এতে নির্যাতন শুরু হয়। এরপর আর যোগাযোগ করতে পারি না। আমাদের সব মোবাইল নাম্বার ব্লক করে দেয়। আমরা কেউ ওই গৃহকর্তীর বাসা চিনতাম না। তাই যেতেও পারি নাই। সামান্য কয়েকটা টাকা মেরে খাওয়ার লোভে ওরা আমার বাপ-মা-মরা এতিম মেয়েটাকে গিলে খেল।’

রেখার চাচা মজিবুর রহমান গাজী অভিযোগ করে বলেন, ‘২০১০ সাল থেকে রেশমা বেগমের বাসায় কাজ করত রেখা। এ পর্যন্ত কোনো টাকা-পয়সা দেয়নি। তাই একবার সে পালিয়ে বাড়ি চলে এসেছিল। ফিরে যাওয়ার পর তাকে ব্যাপক নির্যাতন করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, পাওনা টাকা না দেওয়ার জন্য তাকে ওই গৃহকর্তী মেরে আত্মহত্যার নাটক সাজিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রেখার শরীরে বটির কোপসহ মারধরের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই।’

এ বিষয়ে কথা হয় রাজধানীর বনানী থানার এসআই গুলশান আরার সঙ্গে। তিনি সমকালকে বলেন, ‘গত ৪ আগস্ট গৃহকর্তী রেশমা বেগম থানায় ফোন করে জানান তার গৃহকর্মী অত্মহত্যা করেছে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় আমরা তার বনানীর বাসার বাথরুম থেকে লাশ উদ্ধার করে থানায় আনি। তখন রেশমাকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে থানায় এনেছি। লাশ আনার পর রেখার কোনো স্বজন না থাকায় ময়নাতদন্ত করে বেওয়ারিশ হিসেবে মেডিকেলের হিমঘরে রাখি।’

তিনি বলেন, ‘গৃহকর্তী রেশমাকে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তিনি রেখার ঠিকানা দেন। পরে আমতলী থানার মাধ্যমে গতকাল সোমবার সকালে তার স্বজনদের খবর দেই। আজ মঙ্গলবার সকালে খবর পেয়ে স্বজনরা রেখার মরদেহ নিয়ে যান।’

এসআই গুলশান আরা জানান, রেখার শরীরের অনেক জায়গায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। 

বনানী থানার ওসি নূরে আজম মিয়া সমকালকে বলেন, ‘গৃহকর্মী রেখাকে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে আটক করে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’