জাতীয় পার্টিতে (জাপা) বিরোধ-ভাঙন নতুন নয়। জীবদ্দশায় দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বহুবার সাক্ষী হয়েছেন। প্রতিবার ক্রান্তিকালে বেগম রওশনকে পাশে পেয়েছেন। ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই এরশাদ মারা যান। এরপর থেকেই জাপায় অপাঙ্‌ক্তেয় সাবেক ফার্স্ট লেডি রওশন এরশাদ। পদপদবি থাকলেও ধার নেই, রাজ্য থেকেও মসনদহীন। পৈতৃক ভূমি ময়মনসিংহেও ব্রাত্য এক সময়ের দাপুটে এই নারী। তাঁর বদলে পুরো জেলায় রাজত্ব করছেন ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনের এমপি ফখরুল ইমাম। এই রাজ্যের অঘোষিত রাজা তিনি। তাঁর অনুসারীদের দাপটে কোণঠাসা রওশনপন্থিরা। ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের এমপি ও বিরোধী দলের নেতা রওশনকে পাশ কাটিয়ে ফখরুল একের পর এক উপজেলা কমিটি করছেন; অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নামে বাড়াচ্ছেন বলয়। অথচ জেলা কমিটির সভাপতি রওশন; সাধারণ সম্পাদক ফখরুল। অধস্তন পদে থেকেই কলকাঠি নাড়ছেন ফখরুল। জেলার শীর্ষ দুই নেতাকে ঘিরে বাড়ছে বিভক্তি। তৃণমূলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে বিশৃঙ্খলা। যদিও ফখরুল ইমামের দাবি, কমিটি গঠনে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

ময়মনসিংহ জেলা জাপার নেতারা বলেন, ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই জেলা জাতীয় পার্টির নতুন কমিটি হয়। এতে রওশন এরশাদ সভাপতি ও ফখরুল ইমাম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১১১ সদস্যের কমিটির সভাপতি রওশন দীর্ঘদিন অসুস্থতার কারণে রাজনীতির বাইরে, নিজের সংসদীয় এলাকায়ও আসেন না। দলের কার্যক্রম একাই চালিয়ে নিচ্ছিলেন ফখরুল। এই সুযোগে তিনি পুরো শাখায় ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার ও সব কমিটি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু করেন। তাঁর বিরুদ্ধে রওশনকে না জানিয়ে ও সম্মেলন না করে 'পকেট' কমিটি গঠনসহ দলকে সময় না দেওয়ার নানা অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে যাচ্ছেন দু'পক্ষে। বিভিন্ন কর্মসূচিতে ঘটছে সংঘর্ষের ঘটনা।

চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি মহানগর জাতীয় পার্টির আয়োজনে নগরীর টাউনহল চত্বরে অনুষ্ঠিত প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। সভায় জেলার সহসভাপতি ডা. কে আর ইসলাম তাঁর বক্তব্যে দলের অতিরিক্ত মহাসচিব ও জেলার সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুললে বিরোধ স্পষ্ট হয়। কয়েকজন নেতা বলেন, সম্প্রতি জেলার ত্রিশাল, গফরগাঁও, হালুয়াঘাট, ফুলপুর, তারাকান্দা, নান্দাইল, ঈশ্বরগঞ্জ, মুক্তাগাছা ও ভালুকা উপজেলার কমিটি দেন সাধারণ সম্পাদক এমপি ফখরুল। দলীয় সভাপতিকে না জানিয়ে কোনো সম্মেলন ছাড়াই কমিটিগুলো করায় তৃণমূলে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। এতে রওশন এরশাদের জন্মভূমিতে তাঁকে উপেক্ষা করে এক প্রকার ফখরুলের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

গত ৪ জুলাই রওশন এরশাদ দলের চেয়ারম্যানের কাছে একটি চিঠি দেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, তিনি ময়মনসিংহ জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি হলেও তাঁকে না জানিয়ে সম্মেলন ছাড়াই বিভিন্ন উপজেলায় কমিটি দেওয়া হয়েছে, যা অবৈধ ও অগঠনতান্ত্রিক। ব্যক্তি স্বার্থে কয়েকটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনও তৈরি করা হয়েছে- এসব কমিটি অবিলম্বে বাতিলসহ আট সদস্যের সাংগঠনিক টিমের মাধ্যমে জেলার সব উপজেলা এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে কমিটি গঠনের জন্য বলা হলো। চিঠিতে আরও বলা হয়, রওশনের অনুপস্থিতিতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে জেলা জাতীয় পার্টির সহসভাপতি ডা. কে আর ইসলাম সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে জেলার সাধারণ সম্পাদক ফখরুল ইমাম দীর্ঘদিন এলাকার রাজনীতিতে অনুপস্থিত থাকায় সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেনকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য বলা হলো।

এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের পরামর্শে সিদ্ধান্ত অনুমোদন করার জন্য গত ৬ জুলাই জেলা জাতীয় পার্টির নির্বাহী কমিটির সভা হয়। নগরীর সুন্দর মহল চত্বরে বসা সভার শেষ পর্যায়ে শুরু হয় হট্টগোল। অনুষ্ঠানের বাইরে দলের সহযোগী সংগঠন জাতীয় ছাত্র সমাজের বিবদমান দু'পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়। এমপি ফখরুল সমর্থিত পক্ষের সঙ্গে অন্য পক্ষের বেধে যাওয়া সংঘর্ষের উত্তাল ঢেউয়ে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় আলোচনার মূলমঞ্চে। এ সময় মাইক বন্ধ হয়ে যায়। এতে এক পক্ষ তার ছিড়ে দেওয়ার অভিযোগ করলে অন্য পক্ষ দাবি করে বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল। এক পর্যায়ে হট্টগোলের মধ্যেই এক পক্ষ নতুন দায়িত্ব পাওয়ার দাবি করে, আবার অন্য পক্ষ বলে, সভা শেষ না হওয়ায় কাউকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়নি; আগের সব কমিটিই বহাল আছে। সামগ্রিক বিবেচনায় এই গণ্ডগোলের কারণে এমপি ফখরুলের সিদ্ধান্তই বহাল থাকে!

পরে জেলার দপ্তর সম্পাদক স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সভা পণ্ড হয়েছে। রওশনের চিঠি অনুমোদনের আগেই হট্টগোল শুরু হলে অনুষ্ঠানের সব কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হওয়ায় আগের সব কমিটি বহাল আছে। এদিকে দিবাগত রাতে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরে আরেকটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, দপ্তর সম্পাদকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি সংগঠনবিরোধী ও এখতিয়ারবহির্ভূত। সভায় রওশনের নির্দেশাবলির চিঠি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। এতে এমপি ফখরুলের একক সিদ্ধান্তে হওয়া সব কার্যক্রম ও কমিটি অকার্যকর হয়ে গেছে।

মহানগর জাতীয় পার্টির সভাপতি জাহাঙ্গীর আহমেদ বলেন, এমপি ফখরুলসহ জেলার কয়েকজন নেতা একদিকে অবস্থান নিয়ে পুরো দলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তাঁরা বিভিন্ন উপজেলায় 'পকেট' কমিটি দিয়ে দলে বিভক্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। এগুলো বাতিলের নির্দেশ দিয়েছেন রওশন এরশাদ।

জেলার দপ্তর সম্পাদক ওয়াহিদুজ্জামান আরজু বলেন, একটি সাংগঠনিক কমিটি চলমান থাকাবস্থায় আরেকটি কমিটি হতে পারে না। চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া চিঠি সাংগঠনিকভাবে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় তা ফেরত পাঠানো হয়েছিল জেলায় সভা করে সিদ্ধান্ত নিতে। সভায় উপজেলাগুলোর কমিটি স্থগিত করা হয়নি, বরং মহানগর সভাপতি-সম্পাদক জাতীয় পার্টির শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করতে কমিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তাঁদের কারণেই হট্টগোল হচ্ছে। এখানে কোনো 'গ্রুপিং' নেই। জেলার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোশারফ বলেন, শীর্ষ নেতাদের উপেক্ষা করে ফখরুল ইমাম তাঁর পন্থিদের দিয়ে ৯টি উপজেলায় 'পকেট' কমিটি করেছেন। এতে ত্যাগী ও মাঠের সক্রিয় নেতাকর্মীরা বাদ পড়েছেন, বিপরীতে নিজের অবস্থান শক্ত করতে তাঁর অনুসারীদের পদায়ন করেছেন ফখরুল। সেদিনের সভায় লোক দেখানো আনুগত্য প্রদর্শনের অংশ হিসেবে রওশনের চিঠি এমপি ফখরুল অনুমোদন করলেও ঠুনকো বিষয়ে সভায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে কার্যক্রম থামিয়ে দেওয়া হয়।

ফখরুল ইমাম বলেন, কমিটি দেওয়া নিয়ে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, এসবের ভিত্তি নেই। কেন্দ্রের নির্দেশেই যথাযথ প্রক্রিয়ায় সব কমিটি হয়েছিল। তারপরও সেদিনের সভার শুরুতে ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশনা মেনে নিজের দায়িত্ব হস্তান্তর করেছি। তবে বৈঠকটি কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই পণ্ড হয়ে যায়। তা ছাড়া রওশন এরশাদের আবেদনও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়নি।