হাফিজাবাদ ইউনিয়নের মারুপাড়া গ্রামটি পঞ্চগড় শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে। এই গ্রামের আজিজুর রহমান তিন বছর আগেও ছিলেন কৃষক। বর্গা চাষ করে চলত সংসার। তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে লোকসান গুনে কৃষিকাজ ছাড়তে হয় তাঁকে। এরপর ঋণ নিয়ে ভ্যান কিনলেও অভাব দূর হয়নি। ভ্যান ছেড়ে এখন তিনি অন্যের জমিতে দিনমজুরি করেন; তাও প্রতিদিন কাজ পান না। চাল, ডাল, তেলসহ সব খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সন্তানদের ঠিকঠাক খাবার দিতে পারছেন না। একমাত্র ছেলেকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে এতিমখানায় দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। মারুপাড়ায় ৩ শতাংশ জমিতে গায়ে গা লাগানো তিনটি ঘর। তার একটিতে থাকেন আজিজুর রহমান। অন্য দুই ঘরের বাসিন্দা তাঁর বাবা মোক্তার হোসেন ও ছোট ভাই আনিছুর রহমান। এই ভিটা ছাড়া তাঁদের আর জমিজমা নেই। ছোট বেলায় দর্জির কাজ শেখার চেষ্টা করেছিলেন আজিজুর। সংসারে অভাবের কারণে দর্জি হতে পারেননি। পৈতৃক পেশা কৃষিকাজে যোগ দেন।

করোনার আগেও প্রতিবেশী সাইজুল ইসলামের ৬৬ শতাংশ জমি বর্গা নিয়ে ধান, টমেটো, ভুট্টা, শসা, লাউ, শিম, আলু ও কুমড়া চাষ করেছিলেন আজিজুর। ভালোই কাটছিল দিন। করোনায় জেলার বাইরে থেকে পাইকার আসা বন্ধ হলে আজিজুরের বিক্রিও বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৩ লাখ টাকার টমেটো জমিতে নষ্ট হয়। করোনার পর শসা চাষ করে লোকসান গোনেন। ৭০ বস্তা শসা বিনা পয়সায় দিয়ে দেন পাইকারকে। উল্টো তাঁকে ভ্যান ভাড়া দিতে হয়। নইলে ক্ষেতে শসা পচে দুর্গন্ধ ছড়াত। দাম না পেলেও সার, সেচ, বীজ, পরিচর্যার খরচ ষোলোআনাই করতে হয়।

খরচের ভয়েই আর কৃষিকাজে ফেরেননি আজিজুর। সমিতি থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ভ্যান কেনেন। হাফিজাবাদ, পাঠানপাড়া বাজার থেকে যাত্রী নিয়ে জেলা শহরে যেতেন। তবে কয়েক মাস ধরে যাত্রী সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে ঋণের কিস্তিও দিতে পারছিলেন না তিনি। শেষে মাত্র ১৬ হাজার টাকায় সেই ভ্যান বিক্রি করে দেন।

এককালের কৃষক আজিজুর এখন দিনমজুরি করে দিনে ৩০০-৪০০ টাকা আয় করেন। স্ত্রী লাভলী আক্তার এবং এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। যে ক'দিন কাজ মেলে, তাতে সংসার চলে না।

আট বছর বয়সী ছেলে লাবিব ইসলামকে স্থানীয় আলোর দিশারী স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলেন। পোশাক, বই-খাতা, বেতনসহ লেখাপড়ার খরচ চালাতে পারেননি। তাই মা-বাবা বেঁচে থাকতেও পাশের গ্রামের তেলিপাড়া নেছারিয়া এতিমখানা মাদ্রাসায় লাবিবকে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে দুই বেলা খাবার, পোশাক, লেখাপড়ার সামগ্রী পাচ্ছে সে। আজিজুর এতটুকুর জন্যই ছেলেকে এতিমখানায় দিতে বাধ্য হয়েছেন।

আজিজুরের ছোট ভাই আনিছুরও দিনমজুরি করেন। তাঁর একমাত্র ছেলে জুনায়েদ ইসলামকেও এতিমখানায় ভর্তি করা হয়েছে। আজিজুরের বাবা মোক্তার হোসেন স্থানীয় মসজিদে আজান দেন। বিনিময়ে মাসে ৫০ কেজি মোটা চাল পান। স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর আলাদা সংসার।

আজিজুর বলেন, ভ্যান বিক্রির পর আর শহরে যাননি। কোরবানির ঈদে প্রতিবেশীর দেওয়া মাংস খেয়েছিলেন। এরপর আর মাংস খেতে পাননি। মাছও কিনতে পারেননি। স্থানীয় পাঠানপাড়া বাজারে কেটে বিক্রি করা ব্রয়লার মুরগির মাংসের কেজিও ৩৫০ টাকা। কী করে কিনবেন। ভাত, আলু, শাক দিয়ে দিন পার করছেন। এখন রোপা আমনের চারা লাগানোর কাজ করছেন। আর যেদিন কাজ থাকে না, সেদিন না খেয়ে থাকতে হয়।

আজিজুর বলেন, তিনি করোনা, যুদ্ধ, উন্নয়ন এগুলো বোঝেন না। বুঝতেও চান না। এটুকু বোঝেন, বর্গাচাষি হিসেবে ভালোই ছিলেন। তবে এখন তাঁর কৃষিকাজে ফেরারও উপায় নেই। সারের দাম বেড়ে গেছে, ঠিকমতো পাওয়াও যায় না। ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ খরচও বেড়েছে। বিদ্যুৎ সংকটের কথা বলে এক ঘণ্টা সেচের জন্য ৩০০ টাকা নেন মেশিন মালিকরা। বেড়েছে কীটনাশকের দাম। জমির মালিকরাই কৃষিকাজ করতে পারছেন না। বর্গাচাষিরা আর কী করবেন! তাই দিনমজুরিই একমাত্র ভরসা।