করোনা পরিস্থিতিতে প্রথম ধাক্কা সামাল দিতে দিতেই ইউক্রেন যুদ্ধের ঢেউ লাগে এ দেশেও। ফলে আবার কাবু সাধারণ মানুষ। সর্বশেষ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর জীবনযাত্রায় ব্যয় বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে খেটে খাওয়া মানুষের। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযুদ্ধ নিয়ে সমকালের আয়োজন

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মো. শাহাজাহান ১৫ বছর ঢাকায় থাকেন। সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এটিএম বুথে, এরপর রাত ১০টা পর্যন্ত ইংরেজি শিক্ষার একটি কোচিংয়ে নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করেন। দিনে ১৬ ঘণ্টা কাজ করে মাসে সাড়ে ১৩ হাজার টাকা পান। মা, স্ত্রী ও দুই ছেলে থাকে গ্রামে। মাস ছয়েক আগেও তাঁদের জন্য মাসে ১০-১১ হাজার টাকা পাঠাতে পারতেন। ঢাকায় খরচ বাড়ায় এখন পাঠান ৯ হাজার টাকা। ধানের জমি আর পুকুর থাকলেও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় গ্রামের সংসারেও চলছে টানাটানি।

শাহাজাহানের সঙ্গে কথা হয় গতকাল শুক্রবার বিকেলে। নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহ করা কোম্পানির পোশাক পরা এই ব্যক্তিকে অভাবী মনে হয় না। সব মিলিয়ে ৫০ বছর বয়সী শাহাজাহান বেশ সুদর্শন। তাঁর ২২ বছর বয়সী বড় ছেলে যশোরের সিটি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে পড়েন। ছোট ছেলে স্থানীয় স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ে।

বড় ছেলে বাড়িতে থেকে ক্লাস করেন। তাঁকে প্রতিদিন দিতে হয় ১৫০ টাকা। এর মধ্যে বাস ভাড়া ১২০ টাকা। ডিজেলের দাম দুই দফায় বাড়ার আগে গত নভেম্বরে তা ছিল ৬০ টাকা। মাসে ২০ দিন বড় ছেলের যাতায়াত ও পড়াশোনার খরচ ৩ হাজার টাকা। ছোট ছেলে তিন বিষয়ে প্রাইভেট পড়ে। ২৫০ করে মাসে বেতন ৭৫০ টাকা। স্কুলের খরচ মিলিয়ে হাজার টাকা।

দুই ছেলের পড়াশোনার খরচ মিটিয়ে ৫ হাজার টাকা অবশিষ্ট থাকে শাহাজাহানের স্ত্রীর হাতে। তা দিয়ে ৭০ বছর বয়সী শাশুড়ির চিকিৎসাসহ বাড়ির সব খরচ মেটাতে হয়। কী করে স্ত্রী এই অসম্ভব কাজটি করছেন, তা নিজেও বুঝতে পারেন না শাহাজাহান। জানালেন, পৈতৃক সূত্রে দুই বিঘা জমি পেয়েছেন। তাতে যে ধান হয়, তা দিয়ে বছর চলে।

তবে এবার আমন ধান হবে কিনা বুঝতে পারছেন না শাহাজাহান। আষাঢ়, শ্রাবণেও বৃষ্টি হয়নি। পানির অভাবে ধানের ক্ষেত শুকিয়ে যাচ্ছে। গ্রামে বিদ্যুৎ থাকে না দিনে ২১ ঘণ্টা। সেচ দিতে পারছেন না। ফসল না হলে ভাতের কষ্ট হবে। স্ত্রী বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ করেছেন। তাতে কিছুটা রক্ষা হয়েছে।

আয় বাড়াতে শাহাজাহানের পরিবার গরু পালন করে কোরবানির ঈদে বিক্রি করে। এবার দুটি গরু ১ লাখ ৮৮ হাজার টাকায় বিক্রি করেছে। শাহাজাহান জানালেন, নতুন করে গরু কেনেননি খরচের ভয়ে। ভুসির দাম ২৫ থেকে বেড়ে ৬৫ টাকা হয়েছে। খৈল, ডাল, ওষুধসহ সব কিছুর দাম বেড়েছে। একটি গরুর দিনে ১০০ টাকার খাবার লাগে। এত টাকার খাবার খাইয়ে গরু পুষলে লোকসান হবে।

ঢাকায় নিরাপত্তা কর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের রায়েরবাজারের মেসে মাসে ২৫০ টাকা সিট ভাড়ায় থাকেন শাহাজাহান। পাশেই মাঝবয়সী এক নারীর বাসায় মাসে ৩ হাজার টাকায় দিনে ৩ বেলা খাবার খান। শাহাজাহান জানান, সকালে ভর্তা, ডাল ও ভাত, দুপুরে ডিম অথবা মাছের তরকারি, ডাল ও ভাত এবং রাতে ভাজি, ডাল ও ভাত দেওয়া হয়। শুক্রবার দুপুরে ব্রয়লার মুরগির মাংসের তরকারি দেয়।

গরু-খাসির মাংস দেওয়া হয় না? শাহাজাহান বলেন, গরুর মাংসের চেহারা বছরেও দেখি না। আগে দেড় হাজার টাকায় পুরো মাস খেতাম। দুই বছরে তা বেড়ে ২ হাজার ২০০ টাকা হয় গত ডিসেম্বরে। গত ৭ মাসে তিন দফায় ৮০০ টাকা বেড়েছে খাওয়া খরচ। বাজারের যা অবস্থা, খাবার সরবরাহকারী নারী জানিয়েছেন, সামনের মাস থেকে ২০০ টাকা বাড়াতে হবে।

শাহাজাহান বললেন, তাদেরও দোষ নেই। সব কিছুর দাম বেড়ে গেছে। কী করে ৩ হাজার টাকায় ৩ বেলা খাবার দেবে। রান্না করে দেওয়া নারীরও লাভ হয় না। সবার রান্না থেকে নিজেদের খাবার হয়, এটাই লাভ।

তিনি আরও বলেন, খাবার ও মেস ভাড়া মিলিয়ে মাসে খরচ ৩ হাজার ২৫০ টাকা। হাত খরচ যায় ৬০০-৭০০ টাকা। ধানমন্ডিতে কাজ করার সুবাদে দেখেন, কত মানুষ এক বসায় ১০-২০ হাজার টাকা খরচ করে ফেলছে। অথচ তাঁর পুরো মাসের হাত খরচ ৬০০ টাকা। শাহাজাহান বলেন, ৬০০ টাকায় ঢাকা শহরে কী হয়! নিজের শখ-আহদ্মাদ সব মাটিচাপা দিয়েছেন। কোথাও বেড়াতে যান না। সাপ্তাহিক ছুটি নেন না। কাজ করেন বাড়তি রুজির জন্য। ১৬ ঘণ্টা চাকরি আর ঘুমের পর নিজের জন্য সময় নেই।

এ মাসে এখনও বাড়িতে টাকা পাঠাননি শাহাজাহান। জানালেন, ছুটি পেলে নিজেই যাবেন। তিন মাস পর যাচ্ছেন। ঢাকা থেকে ঝিনাইদহে আসা-যাওয়ার বাস ভাড়া ছিল ৯০০ টাকা। গত নভেম্বরে ডিজেলের দাম বাড়ায় হয় ১ হাজার ১০০ টাকা। এবার হয়েছে ১ হাজার ৩০০ টাকা। খরচের ভয়ে যেতে পারেন না বলে মা, স্ত্রী-সন্তানের মুখও দেখতে পান না। শাহাজাহান বলেন, যেভাবে খরচ বাড়ছে তাতে মনে হয় না ঢাকায় টিকতে পারবেন।