জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে চালের বাজারে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকামে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ৩ থেকে ৪ টাকা। মিলগেটে সবচেয়ে ভালো মানের সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজি দরে। যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত দেড় মাসে মিলগেটেই সব ধরনের চালের দাম ৮ থেকে ১০ টাকা বেড়ে গেছে।

চালকলের মালিকদের দাবি, ধান ও ডিজেলের দাম বাড়ায় চালের বাজারে বড়সড় ধাক্কা লেগেছে। বাধ্য হয়ে চালের দাম বাড়াচ্ছেন তাঁরা। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে দেশে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশ থেকে আমদানি, খোলাবাজারে চাল বিক্রি বাড়ানো এবং ডিজেলের দাম কমানোর বিকল্প নেই।

গত ৫ আগস্ট সকালেও খাজানগর মোকামে সরু চালের পাইকারি দর ছিল ৬৪ থেকে ৬৬ টাকা। সপ্তাহের ব্যবধানে গতকাল শুক্রবার সেই চাল বিক্রি হয়েছে ৬৮ থেকে ৭০ টাকা কেজি। কুষ্টিয়া পৌর বাজারে একই চাল বিক্রি হচ্ছে ৭২ থেকে ৭৩ টাকায়। মাঝারি মানের সরু চালের দাম ৬৫ থেকে ৬৭ টাকা কেজি। এগুলো ভেজাল বলে দাবি স্থানীয়দের। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন জাতের ধান থেকে তৈরি চাল মিনিকেট বলে বিক্রি করছেন চালকলের মালিকরা।

আটাশ ও কাজললতা চাল এখন মিলগেটেই বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৫৭ টাকা। যা গত সপ্তাহে ছিল ৫২ থেকে ৫৪ টাকা কেজি। একইভাবে দাম বেড়ে মিলগেটেই এখন বাসমতী চাল বিক্রি হচ্ছে ৭৫ থেকে ৭৭ টাকা দরে। আর মোটা চালের কেজি ৫০ টাকার ওপরে।

চালকল মালিক সমিতির সভাপতি ওমর ফারুক জানান, উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলের মোকাম থেকে এক ট্রাক ধান খাজানগর পৌঁছাতে আগে ভাড়া ছিল ১৬ হাজার টাকা। এখন সেই ট্রাক ভাড়া ২১ হাজার টাকা। একইভাবে ঢাকায় এক ট্রাক চাল পৌঁছাতে সমপরিমাণ টাকা লাগছে। এতে চালের দাম বেড়েছে।

এক মাস আগেও যে ধান ১ হাজার ৩০০ টাকা মণ ছিল, সেই ধান এখন ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকা। কৃষক ও ফড়িয়ারা কম দামে আর ধান বিক্রি করছেন না। এ অবস্থায় চালের বাজার বাড়াটাই স্বাভাবিক।

মিল মালিক সমিতির আরেক অংশের সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন প্রধান বলেন, এলসি করা চাল দেশে আনতে না পারা চালের বাজার বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি হঠাৎ করে ধানের বাজার অস্বাভাবিক বেড়েছে, তার ওপর ডিজেলের দাম বাড়ায় চাপে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ কারণেই গত সপ্তাহের তুলনায় সব ধরনের চালের দাম মিলগেটে বেড়েছে। সামনে আমন উৎপাদন না বাড়ানো গেলে এবং বাইরে থেকে চাল না আমদানি করলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।

চালকল মালিকদের ভাষ্য, সরকারি খাদ্যগুদামে প্রচুর চাল রয়েছে। খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) বাড়ানো গেলে নিম্ন আয়ের মানুষ স্বস্তি পেত। এর প্রভাব পড়ত চালের বাজারেও।

সপ্তাহ ব্যবধানে আবার চালের দর বাড়ায় বেকায়দায় পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। কুষ্টিয়া শহরের ঠেলাগাড়ি শ্রমিক মতিয়ার হোসেন প্রতিদিনের আয় দিয়ে চাল কিনে রাতে বাড়ি ফেরেন। তাঁর ভাষ্য, পাঁচ সদস্যের সংসারে তিন বেলার চালের খরচ অনেক। প্রতিদিন দুই কেজি চাল কিনতেই তাঁকে ১২০ টাকার মতো খরচ করতে হচ্ছে। আগে ৮০ টাকা হলেই দুই কেজি মোটা চাল পাওয়া যেত। ডাল ও তেলের দাম বাড়ার কারণে সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে তাঁর।

কুষ্টিয়া পৌর বাজারের ওএমএস ডিলার আকবর আলী বলেন, সরকার মাঝখানে আটা বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন প্রতিদিন মাত্র ৩০০ কেজি আটা বরাদ্দ দেয়, তাতে কিছু হয় না। চালের বরাদ্দ প্রতিদিন ১ হাজার কেজি থেকে কমিয়ে ৮০০ কেজি করা হয়েছে। এ বরাদ্দে কিছুই হয় না। অনেকে খালি হাতে ফিরে যান। ভিড় আগের তুলনায় বাড়ছে।

বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাঝেমধ্যে খাজানগর চাল মোকামে অভিযান চালায় ভোক্তা ও খাদ্য অধিদপ্তর। জেলা খাদ্য কর্মকর্তা সুবীর নাথ চৌধুরী বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ার পর মোকামে চালের দাম বাড়িয়েছেন মিল মালিকরা। কোনো মিল মালিক সংকট তৈরি করে যাতে ফায়দা লুটতে না পারে সে জন্য নিয়মিত মনিটর করা হচ্ছে।