রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে বিদ্যুৎ বিভাগ ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত লোডশেডিং থাকার কথা। কিন্তু এই উপজেলায় কোনো কোনো দিন ৭-৮ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকে না। এতে এখানকার ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের নলিয়া ডাঙ্গাহাতিমোহন গ্রামের জলিল মিয়া জুট মিলস কয়েক বছর ধরে মোটামুটি ভালোই চলছিল। সহজে শ্রমিক পাওয়া ও ভালো বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল এর অন্যতম কারণ। তবে বিদ্যুতের চলমান ভয়াবহ সংকটে লোকসানের ঝুঁকিতে পড়েছে ২০১৫ সালে স্থাপিত কারখানাটি।

এটি ২০ ফ্রেমের। এর মধ্যে ৭-৮টি ফ্রেম চালু থাকলে ২৪ ঘণ্টায় গড়ে বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় ২৩০০ থেকে ২৪০০ ইউনিট। এতে খরচ হয় প্রতিদিন ৩২ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে এখানকার ৬৫০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটরটি ৮ ঘণ্টা চালাতে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ডিজেল প্রয়োজন হয়।

কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম ফরিদ হোসেন বাবু বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুতের উৎপাদন বন্ধ রেখে লোডশেডিং কোনো সমাধান হতে পারে না। কারণ লোডশেডিং থাকলে জেনারেটরে জ্বালানি তেল খরচ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হচ্ছে। এতে আরও বেশি জ্বালানির অপচয় হচ্ছে। জেনারেটরে এক লিটার ডিজেলে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রে হয় তার চেয়ে অনেক বেশি।

লোডশেডিংয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছেন বালিয়াকান্দির ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরাও। ক্ষণে ক্ষণে লোডশেডিংয়ে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন স্বল্প পুঁজির উদ্যোক্তারা।
বালিয়াকান্দি বাজারের 'বন্যা ফুড প্রোডাক্টস' নামের খাদ্যসামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যুৎ না থাকায় এখানকার ৫ জন কর্মচারী অলস বসে আছেন। লোডশেডিংয়ে তাঁদের বিকল্প ব্যবস্থা নেই। প্রতিষ্ঠানের মালিক হাসিবুর রহমান জানান, বিদ্যুতের এই পরিস্থিতিতে তাঁর মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যবসা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকলে শ্রমিকরা বসে থাকতে বাধ্য হন। এতে পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। অন্যদিকে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ইচ্ছা করলেও দাম বাড়ানো যায় না। এতে তাঁদের প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হচ্ছে।
অন্যদিকে বর্তমানে চলছে আমন ধান চাষের ভরা মৌসুম। একদিকে রাজবাড়ী জেলায় অনাবৃষ্টি, অন্যদিকে চরম বিদ্যুৎ সংকটে আমন ধানের ফলনে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বালিয়াকান্দির জামালপুর ইউনিয়নের গোষাই গোবিন্দপুর গ্রামের কৃষক খোকন শেখ জানান, আমন চাষের মৌসুম শুরুর পর থেকেই যখন তখন বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এতে ক্ষেতে সেচব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো আমন ধানের ফলন ঠিকমতো পাওয়া যাবে না।
রাজবাড়ী জেলা কৃষি বিভাগের উপপরিচালক শহীদ নুর আকবর লোডশেডিংয়ের কারণে আমন চাষ ব্যাহত হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টিপাত কম হলেও আগামী কয়েক দিন বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি। পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে আমন চাষে কোনো অসুবিধা হবে না। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত আমন ধান রোপণ করা যাবে। এ ছাড়া বোরো ধানের তুলনায় আমন ধান চাষে অপেক্ষাকৃত কম সেচ লাগে।

এ উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও ওয়েস্টার্ন জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। বালিয়াকান্দিতে বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো অফিস নেই। রাজবাড়ী জেলা শহর থেকে কার্যক্রম চালানো হয়। তাই উপজেলাবাসীর ভোগান্তির সীমা নেই। ছোট-বড় সব ধরনের সমস্যার জন্য এ এলাকার গ্রাহকদের রাজবাড়ী জেলা সদরে ঘুরতে হয়।

রাজবাড়ী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মফিজুর রহমান জানান, তাঁদের ২ লাখ ১৫ হাজার গ্রাহকের জন্য প্রতিদিন ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। এর বিপরীতে তাঁরা পান ২৮ মেগাওয়াট। স্বাভাবিক কারণেই লোডশেডিং দিতে বাধ্য হন। প্রতিনিয়ত রাজবাড়ীর জন্য বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ানোর তাগিদ দিলেও তা পাচ্ছেন না।

ওয়েস্টার্ন জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির উপসহকারী প্রকৌশলী (বালিয়াকান্দি) বাপ্পি দাস জানান, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য তাঁদের প্রয়োজন হয় অন্তত ২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। কিন্তু তাঁরা পান মাত্র ১২ মেগাওয়াটের মতো। এতে অঞ্চল ভাগ করে লোডশেডিং দিতেই হয়। তবে এক মাসের মধ্যে লোডশেডিংয়ের সময় অনেকাংশে কমে আসবে বলে তিনি আশাবাদী।