বরগুনায় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষকালে পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জের ঘটনায় জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহররম আলীকে প্রত্যাহার করে বরিশাল ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি। এ ঘটনায় মহররম আলীর বরখাস্তসহ বিচার দাবি করছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু। তবে সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটির সভাপতি ও সম্পাদক। এ ঘটনায় তাদের বিরোধের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে।
সোমবারের হামলার ঘটনা সারাদেশে আলোচিত হয়। পুলিশ এ ঘটনা তদন্তে বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) এস এম তারেক রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন পাথরঘাটা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার তোফায়েল আহমেদ সরকার ও বরগুনা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের পাবলিক রিলেশন অফিসার পুলিশ পরিদর্শক শাহাবুদ্দীন আহমেদ।

বরগুনা পুলিশ সুপার মোহম্মদ জাহাঙ্গীর মল্লিক বলেন, তদন্ত কাজে প্রভাব বিস্তার রোধ এবং তাঁর নিরাপত্তার জন্য মহররম আলীকে বরগুনার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে বরিশাল রেঞ্জ কার্যালয়ে যুক্ত করা হয়েছে।
যে কারণে সংঘর্ষ :আট বছর পর গত ১৭ জুলাই বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ২৪ জুলাই রেজাউল কবির রেজাকে সভাপতি এবং তৌশিকুর রহমান ইমরানকে সাধারণ সম্পাদক করে ৩৩ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় কমিটি।
তবে সভাপতি পদপ্রত্যাশী সবুজ মোল্লার নেতৃত্বে একটি গ্রুপ ঘোষিত কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করে বিভিন্ন সময় বিক্ষোভ মিছিল, সভা-সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। এমনকি কমিটিকে কেন্দ্র করে দু'পক্ষের মধ্যে একাধিকবার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াসহ শহরে মহড়া দেওয়া হয়। ভাঙচুর করা হয় মোটরসাইকেলসহ একাধিক যানবাহন। এক মাস ধরে ছাত্রলীগের দু'পক্ষের মহড়া এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় আতঙ্কে ছিলেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। এ নিয়ে শম্ভু এবং তাঁর বিরোধী পক্ষের বিরোধ তীব্রতর হয়।

এ বিরোধের জেরে গত ৫ আগস্ট শেখ কামালের জন্মদিনে বরগুনা সরকারি কলেজে একই স্থানে কর্মসূচি দেয় দুই গ্রুপ। পরে সহিংসতা এড়াতে বরগুনা সরকারি কলেজ এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। এভাবে গত এক মাস ধরে দু'গ্রুপের সংঘাত এড়াতে কাজ করে পুলিশ প্রশাসন।
এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার জাতীয় শোক দিবসে জেলা ছাত্রলীগের পদবঞ্চিত গ্রুপকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের ছাত্রলীগের সভাপতি ও সম্পাদকের নেতৃত্বে শ্রদ্ধা নিবেদনের সুযোগ দেওয়া হয়। বরগুনা জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এই দু'গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হতে পারে বলে তাঁদের কাছে আগেই তথ্য ছিল। এ কারণে পদবঞ্চিত গ্রুপ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে যাওয়ার পর পুলিশ গেট আটকে দেয়। অন্য গ্রুপ শিল্পকলা একাডেমিতে প্রবেশ না করে র‌্যালি নিয়ে শহরে চলে যাবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু শিল্পকলা একাডেমির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গেছে।

নতুন কমিটির সভাপতি রেজাউল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপকমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক খলিলুর রহমানের ভাইয়ের ছেলে। অন্যদিকে সভাপতি পদবঞ্চিত ও বর্তমান কমিটির সহসভাপতি সবুজ মোল্লা বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য শম্ভুর সমর্থক।

সোমবার রাতে বরগুনা প্রেস ক্লাবে শোক দিবসের আলোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শম্ভু বলেন, পুলিশ কর্মকর্তা মহররমকে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

অন্যদিকে রাতেই বরগুনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল ও সাধারণ সম্পাদক তৌশিকুর বলেন, তাঁরা শোক র‌্যালি নিয়ে শিল্পকলা একাডেমির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় পেছন দিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। সেখানে পুলিশের গাড়িসহ কয়েকটি মোটরসাইকেল ভাঙচুরের খবর পান তাঁরা। তাঁদের দাবি, শিল্পকলার সামনে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রলীগের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ওখানে যারা ছিল তারা ছাত্রলীগের কেউ না। এ ঘটনায় পুলিশ প্রশাসন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ায় জেলা ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানানো হয়।
সভাপতি পদবঞ্চিত সবুজ মোল্লা বলেন, জেলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করার কথা। কিন্তু কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতারা বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের কোনো ধরনের সুপারিশ অথবা পরামর্শ না মেনে তাঁদের ইচ্ছামতো কমিটি ঘোষণা করেছেন। এ কারণে তাঁরা বর্তমান কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এদিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বরগুনায় সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

আমতলীতে বিক্ষোভ :আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি জানান, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে এবং মহররম আলীকে বরখাস্ত করার দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আমতলীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। আমতলীর বঙ্গবন্ধু সড়কের আল হেলাল চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি নতুন বাজার চৌরাস্তা মোড়ে গিয়ে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।

বিষয় : বরগুনায় পুলিশের লাঠিচার্জ

মন্তব্য করুন