লাল, নীল, কমলা, কালো, বাদামি, হলুদ- খালি চোখে এগুলো রং। এসএম হাসানুর রহমানের কাছে এগুলো একেকটি স্বপ্ন। তাঁর জীবন রাঙানোর উপকরণ, ভাগ্য বদলের জিয়নকাঠি। খুলনার দিঘলিয়ার মহেশ্বরপুর গ্রামে তাঁর পুকুর ও হাউসের পানিতে ভাসছে, ডুব দিচ্ছে নানা রঙের মাছ। গোল্ড ফিশ, কমেট, কই কার্ভ, ওরেন্টা গোল্ড, মলি, গাপটি, অ্যাঞ্জেল, সিল্ক্কি কৈ প্রভৃৃতি বর্ণিল মাছ দেখলে চোখ জুড়ায়, মন ভরে যায়। সাধারণত বাসাবাড়ির অ্যাকুয়ারিয়ামে শোভা পেয়ে থাকে এসব মাছ।

ইতোমধ্যে রঙিন মাছের চাষ করে জীবনকে রাঙিয়েছেন হাসানুর। সচ্ছলতা ফিরেছে সংসারে। তাঁকে দেখে এলাকার অনেকে আগ্রহী হচ্ছেন, নিজের সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হচ্ছেন। তিন বছর আগে পুকুর ও হাউসে রঙিন মাছের চাষ শুরু করেন হাসানুর। লাভে লাভে বেড়েই চলে চাষের পরিসর। এখন তাঁর ২০ শতক জমিতে ৫টি পুকুর ও ৭২টি হাউসে ১০৫ প্রজাতির প্রায় ১৩ লাখ পিস রঙিন মাছ রয়েছে।

সমকালকে তরুণ এই উদ্যোক্তা জানান, তাঁর কাছে প্রতি পিস ১ টাকা থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা দামের মাছ রয়েছে। প্রতি মাসেই দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৫০ হাজার পিস মাছ বিক্রি করেন। সব খরচ বাদে ২ লাখ টাকার মতো থাকে। বিক্রয় মূল্যের প্রায় ৯৫ শতাংশই লাভ হয়। চাষাবাদের জন্য তাঁর ফার্মে রয়েছেন সাতজন কর্মচারী।

হাসানুর বলেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে পাইকারি দরে মাছ নিয়ে যান। বিদেশে এই মাছ রপ্তানির সক্ষমতা আমার রয়েছে। অনেকে নিতে চান। কিন্তু অনুমতি না থাকায় রপ্তানি করতে পারছি না।

নগরীর বাগমারা মেইন রোডের বাসিন্দা গাজী শাহনেওয়াজ পিপলু বছর দুয়েক আগে শখের বশে বাড়ির ছাদে চাষ শুরু করেন। লাভের মুখ দেখায় এখন তিনি বাণিজ্যিকভাবে চাষ করছেন। প্রায় ৫০টি ট্যাঙ্ক ও ড্রামে করা চাষ থেকেই মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা আয় করছেন। পিপলু বলেন, শীতকালে কিছু সংখ্যক রঙিন মাছ মারা যায়। কিন্তু কেন মৃত্যু হয়, অনেক চেষ্টা করেও কূলকিনারা করতে পারিনি। নতুন কেউ রঙিন মাছ চাষে এলে প্রথম ছয় মাস খুব ছোট পরিসরে করার পরামর্শ দেন তিনি।

হাসানুর ও পিপলুর মতো খুলনায় অনেকেই রঙিন মাছ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। কেউ পুকুরে, কেউ হাউস করে আবার কেউ বাড়ির ছাদে চাষ করছেন। এর মাধ্যমে সংসারে সচ্ছলতা ফিরছে। নগরীর টুটপাড়া এলাকার রবিউল হোসেন ও আরিফুল ইসলাম জানান, রঙিন মাছ চাষের বিষয়ে মৎস্য অফিসের তেমন সহায়তা পাওয়া যায় না।

প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য সহযোগিতা পেলে অনেক বেকারের জীবন পাল্টে দিত রঙিন মাছ।

জেলা মৎস্য অফিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খুলনায় এখন রঙিন মাছের চাষ করছেন ৪০ থেকে ৪৫ জন। অবশ্য এই চাষে জড়িতরা বলছেন, সংখ্যাটি ৩ শতাধিক। আর অ্যাকুয়ারিয়ামসহ রঙিন মাছ বিক্রির দোকান আছে ৬০-৬৫টি।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়দেব পাল বলেন, 'ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজিক্যাল প্রজেক্ট' নামে একটি প্রকল্পের আওতায় খুলনার ডুমুরিয়া, পাইকগাছা, দাকোপ ও বটিয়াঘাটায় তাঁদের কার্যক্রম চলছে। তাঁরা ১০ জনকে রঙিন মাছ চাষের প্রশিক্ষণসহ সহায়তা দিয়েছেন। ভবিষ্যতে প্রকল্পের আওতা বাড়ানো হবে। রপ্তানির সুযোগ তৈরি করা গেলে দেশও লাভবান হবে।