রাঙামাটি সদর উপজেলার মগবান ইউনিয়নের সোনারাম কার্বারিপাড়ার সুশান্ত তংচংগ্যা। পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে তাঁর পড়ালেখার পাট চুকে যায় এসএসসির পরই। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ভাঙলেও থেমে যাননি এ যুবক। কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ২০১৬ সালে কাপ্তাই হ্রদবেষ্টিত পাহাড়ে বাড়ির আঙিনায় গড়ে তোলেন ফল ও সবজির মিশ্র বাগান। পাহাড়ি ঢালু জমিতে ১০ একরের সেই বাগানেই আজ সফল তিনি।

সুশান্তের এই বাগানে রয়েছে প্রায় ২০ প্রজাতির ফলের গাছ ও বিভিন্ন প্রজাতির সবজি। ২০২০ সাল থেকে বাগানের প্রায় সব গাছে এসেছে ফল। জুলাইয়ে শুধু লটকান বিক্রি করেই প্রায় এক লাখ টাকা আয় করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, তাঁর বাগানে কর্মসংস্থান হয়েছে স্থানীয় ১২ বেকার যুবকের।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাগানজুড়ে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফলের গাছ ও সবজি। ফলন এসেছে কলা, রেড লেডি পেঁপে, চালতা ও লেবুগাছে। এ ছাড়া বিলাতি ধনিয়া পাতাসহ অন্যান্য সবুজ সবজির সমারোহ দেখা যায়।

সুশান্ত জানান, তাঁর বাগানে রয়েছে চার জাতের বরই (বল সুন্দরী, কাশমেরী, দেশি আপেল কুল ও দেশি মিষ্টি কুল)। এ ছাড়া রয়েছে আম, কাঁঠাল, লটকান, লিচু, আমলকী, পেঁপে, তেঁতুল, মাল্টা, লেবু, বেল, নারিকেল, সুপারি, রাম্বুটানসহ অন্যান্য বারোমাসি ফল। রয়েছে নানা জাতের সবজি।

তিনি বলেন, সামান্য পড়াশোনা করে চাকরির আশায় বসে না থেকে নিজ জমিতে মিশ্র ফল বাগান করার চিন্তা করি। কৃষি বিভাগ থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পাশাপাশি নিজের চেষ্টায় সফলতা এসেছে। বাগানে কীটনাশক, ওষুধ, আনুষঙ্গিক খরচ ও শ্রমিকদের মজুরি মেটানোর পরও এখন বছরে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকার মতো থাকে। এ দিয়ে ভালোভাবেই তাঁর সংসার চলে যায়।

পাহাড়ের বুকের সফল এ চাষি জানান, আগামীতে বাগানের পরিধি বাড়িয়ে ড্রাগন, ধরিমন-৯৯ আপেলসহ অন্য প্রজাতির ফলের চাষ করবেন। বাগান বড় হলে আরও মানুষের কর্মসংস্থান হবে। তিনি বলেন, যাদের জমি রয়েছে, খালি না রেখে মিশ্র ফসল বাগান করা উচিত।

শিক্ষিত যুবকদের বসে না থেকে কৃষি কাজে এগিয়ে আসতে হবে। এতে অবশ্যই সফলতা আসবে।

প্রত্যন্ত এলাকায় বাগান হলে উৎপাদিত ফসল বাজারজাত করতে কোনো অসুবিধা হয় না বলে জানান সুশান্ত। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা অর্ডার দিলে তিনি শহরের তবলছড়ি বাজারে ফল বা সবজি পাঠিয়ে দেন। এ ছাড়া অনলাইনের মাধ্যমেও তাঁর বাগান থেকে ফল ও সবজি বিক্রি করে থাকেন।

এদিকে সুশান্তের এমন সফলতার পর স্থানীয় এবং পার্শ্ববর্তী গ্রাম আমছড়িতে অনেকেই মিশ্র ফলের বাগান গড়ে তুলেছেন। তাঁরাও সফল কৃষি উদ্যোক্তা স্বপ্ন বুনছেন। ওই গ্রামের বাসিন্দা বাবুল চাকমা, শ্যামল চাকমা ও জয়মঙ্গল চাকমা জানান, গ্রামের দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানে সুশান্তের বড় ভূমিকা রয়েছে। তাঁকে দেখে তাঁরাও বাগান গড়ে তুলেছেন।

কৃষি অধিদপ্তরের রাঙামাটি সদর উপজেলার মানিকছড়ি ব্লক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শান্তনু খীসা জানান, পাহাড়ে কৃষি উদ্যোক্তা গড়ে তোলার জন্য তিনি একজন প্রকৃত উদাহরণ। তিনি আধুনিক কৃষি উদ্যোক্তাও বটে। তাঁর কৃষিবিষয়ক জ্ঞান অনেক ভালো। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকেও শুরু থেকে তাঁকে পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

রাঙামাটি সদর উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবু মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, সুশান্তের নতুন কিছু করার ও শেখার আগ্রহ রয়েছে। তিনি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য একজন পথপ্রদর্শক। কৃষি বিভাগ থেকে তাঁকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার পাশাপাশি প্রণোদনা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।