সৈয়দ মনোয়ার হোসেন প্রায় চার দশক অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন উপ-খাতের সঙ্গে সংযুক্ত। বর্তমানে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম), সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসসহ (সিইজিআইএস) অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে একাধিক প্রকল্পের আওতায় নৌপরিবহন ও আন্তঃআঞ্চলিক নৌপরিবহন ব্যবস্থার পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক ও সচিব পদে কাজ করে ২০১১ সালে অবসর গ্রহণ করেন। সৈয়দ মনোয়ার হোসেনের জন্ম ১৯৫৩ সালে, বরিশালে।

সমকাল: ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির পর যাত্রীবাহী নৌযানে ৩০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক?
মনোয়ার হোসেন: কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। একটি জাহাজ পরিচালনায় যেসব খাতে ব্যয় হয়, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় জ্বালানি খাতে। পরিচালন ব্যয়ের সব উপাদানের আনুপাতিক হার রেকর্ডভুক্ত থাকলে জ্বালানি বা মজুরি বৃদ্ধির কারণে ভাড়া কতটা বাড়বে তা হিসাব করা সহজ হয়। তবে এ তথ্য জানা না থাকার কারণে দরকষাকষির মাধ্যমে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে বলে মনে হয়। ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে ৩০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি হিসাবে মেলে না। হয়তো অন্য ইমপ্যাক্ট যুক্ত করা হয়েছে।
সমকাল: সড়কপথের তুলনায় নৌপরিবহনকে জ্বালানি সাশ্রয়ী বলা হয়। ভাড়া নির্ধারণে সে মানদণ্ড কি অনুসরণ করা হয়?
মনোয়ার হোসেন: মোটেও অনুসরণ করা হয় না। পরিচালন ব্যয় বিবরণী জানা না থাকার কারণে এই অবাস্তব-অযৌক্তিক ঘটনা ঘটেছে। নৌপরিবহন খাতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন খরচ অন্য যে কোনো পরিবহনের তুলনায় কম। স্বাভাবিক কারণেই এখানে বাসের তুলনায় ভাড়া কম হবে। কিন্তু সম্প্রতি লঞ্চের যে ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে কিলোমিটারপ্রতি সড়কপথের চেয়ে নৌপথের ভাড়া বেশি।
সমকাল: বাসে নির্দিষ্টসংখ্যক আসন থাকে। কিন্তু লঞ্চের ডেকে গণহারে যাত্রী বহন করা হচ্ছে। তারপরও...
মনোয়ার হোসেন: বাসের চেয়ে লঞ্চে, বিশেষ করে রাতে চলাচলকারী লঞ্চে যাত্রীপ্রতি স্থান বেশি লাগে। কারণ লঞ্চের ডেকে রাতে যাত্রীরা বাসাবাড়ির মতো ঘুমিয়ে যাতায়াত করেন। ফলে একজন যাত্রীর জন্য যে পরিমাণ ডেকের জায়গা লাগে, সমপরিমাণ জায়গায় বাসের তিনটি আসন বসানো সম্ভব। বাসে নিয়মিত যে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ দেখা যায়, লঞ্চে সে রকম দেখা যায় না। শুধু ঈদ মৌসুমে লঞ্চে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। তা ছাড়া লঞ্চে বাসের মতো যত্রতত্র থেকে যাত্রী তোলার সুযোগ নেই। তবে হ্যাঁ, লোকাল লঞ্চে নির্দিষ্ট টার্মিনাল থেকে যাত্রী ওঠানামা করা হয়। কিন্তু ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটের লঞ্চগুলোতে পথে কোথাও যাত্রী ওঠানামা করা হয় না।
সমকাল: ডিজেলের দাম বাড়ার আগে ঢাকা-বরিশাল রুটে ভাড়া কিছুটা কমেছে। তবে উপকূলীয় রুটে ভাড়া বাড়িয়েছে...
মনোয়ার হোসেন: আমি মনে করি, ভাড়ার যে হার, সেখান থেকে কিছুদিনের মধ্যেই আবার কমে আসবে। বিশেষ করে ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতকারী লঞ্চের ক্ষেত্রে এটা অনিবার্য। আর উপকূলীয় নৌপথে যাত্রী পরিবহনে স্থানীয় সরকার সংস্থার ইজারা পদ্ধতির ফলে বেশ অনিয়ম ও জুলুম আছে। ইজারাদারের একচেটিয়া সুবিধার কারণে সাধারণ যাত্রী অসহায়। এই দ্বৈত ব্যবস্থাপনার অবসান ঘটিয়ে বিআইডব্লিউটিএর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
সমকাল: ডিজেলের দাম কমলে ভাড়া কমার সম্ভাবনা কতটুকু?
মনোয়ার হোসেন: আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি- নৌপথে যাত্রী ভাড়া কমবে।
সমকাল: ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের বদলে নৌযান চালাতে বিকল্প ভাবা যায়?
মনোয়ার হোসেন: এ জন্য গবেষণা দরকার। বহির্বিশ্বে গবেষণা চলছে। বাংলাদেশে সে উদ্যোগ নেই। গ্যাস ব্যবহারের উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। গবেষণা ছাড়া পরিবর্তন আশা করা যায় না। এক সময় ঢাকা মহানগরীতে ডিজেলচালিত তিন চাকার যানবাহন চলত। এসব যানবাহনের কালো ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষিত হতো। পরে সিএনজিচালিত যানবাহন চালু করে ডিজেলচালিত ওইসব গাড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয়। লঞ্চ, স্টিমার ও পণ্যবাহী কার্গোতে সিএনজি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া যেত। আমরা জানি, খরস্রোতা পদ্মা-মেঘনা নদীর ওপর দিয়েই দক্ষিণাঞ্চলের লঞ্চ চলাচল করে। লঞ্চ চলাকালীন পাখার আশপাশে পানিতে আরও বেশি স্রোত সৃষ্টি হয়। এখান থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় কিনা, সে বিষয়ে গবেষণা করা দরকার। সম্প্রতি জাতীয় গ্রিডের ক্ষেত্রেও আমরা শুনেছি, ডিজেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়বহুল। কিন্তু জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় সবচেয়ে কম। আগেই বলেছি, গবেষণা করলে অনেক দুয়ার খুলে যাবে। বায়ু থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। দিনে চলাচলকারী জাহাজে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল বসানোর বিষয়টিও গবেষণায় আসতে পারে।
সমকাল: পদ্মা সেতুর প্রভাবে ঢাকা-বরিশাল রুটে গ্রিনলাইন ওয়াটার সার্ভিস বন্ধ হয়ে গেছে। কমেছে বিমানের ফ্লাইট। লঞ্চে এর প্রভাব পড়বে কি?
মনোয়ার হোসেন: পদ্মা সেতু চালু হওয়ার ফলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে বিরাট প্রভাব পড়েছে। যদি দুয়ার-দুয়ার পরিবহনের আনুপাতিক সময় হিসাব করা হয়, দেখা যাবে আকাশপথ ও সড়কপথ প্রায় সমান। সুতরাং ব্যয়টাই বিবেচনায় আসবে। ফলে আকাশপথ আর কখনোই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারবে না। নৌপথে বিরূপ প্রভাব পড়বে কেবিনের যাত্রীর ক্ষেত্রে। কিন্তু ডেকের যাত্রীর ক্ষেত্রে মাধ্যম পরিবর্তনের ফলে ৩০ শতাংশের বেশি ভাড়া কমবে বলে মনে হয় না। সেতু চালুর সূচনা পর্বে যে প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা কয়েক মাসের মধ্যে বদলে যাবে। গরিব মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ নিয়মিত অনেক যাত্রী তুলনামূলক সুবিধার কথা বিবেচনা করে নৌপথে ফিরে আসবে।
সমকাল: নদীতে ডুবোচর আর ভাঙনকবলিত এলাকায় অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের ফলে গভীরতা হ্রাস পাওয়ায় নৌযান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
মনোয়ার হোসেন: নদীর বিপন্ন পরিস্থিতির অনেক কারণ আছে। দেশের ভেতরে ও বাইরে পানি প্রত্যাহার, পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী স্থাপনা নির্মাণ, মরফোলজিক্যাল ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার ফলে নদী ক্রমাগত বিপন্ন হচ্ছে এবং নাব্য হ্রাস পাচ্ছে। অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণও এর অন্তর্ভুক্ত। ডুবোচর হচ্ছে এই অবনতিশীল পরিস্থিতির বহিঃপ্রকাশ। নিরাপদ নৌচলাচলের ক্ষেত্রে এটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। নিয়মিত জরিপ ও ডুবোচর চিহ্নিত করার মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এ জন্য সংশ্নিষ্টদের তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে। কারণ ডুবোচরে ধাক্কা লেগে জাহাজডুবি হলে জাহাজে থাকা পণ্য আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। সম্প্রতি মেঘনা নদীতে ডুবোচরে ধাক্কা লেগে চিনি ও পাথরবাহী দুটি জাহাজডুবি ঘটেছে। চিনি গলনশীল হওয়ায় দ্রুত পানিতে মিশে যায়। এ ছাড়া নদীপথে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছানো হয়। সুতরাং নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। জাহাজে ডাকাতি-চাঁদাবাজি ঠেকাতে যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সজাগ থাকতে হবে; তেমনি নিরাপদ নৌচলাচলের জন্য নদীখননের পাশাপাশি ডুবোচর চিহ্নিত করতে পর্যাপ্ত বয়া ব্যবহার করতে হবে।
সমকাল: আপনি যেহেতু বিআইডব্লিউটিএতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, তাই সরাসরি সম্পৃক্ত না হলেও একটি ভিন্ন প্রশ্ন করছি। বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনে যাত্রী প্রবেশে টিকিট লাগে না। কিন্তু লঞ্চ টার্মিনালে প্রবেশে ১০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
মনোয়ার হোসেন: বাস টার্মিনালে যাত্রীর প্রবেশ ফি নেওয়া হয় না; নৌ টার্মিনালে নেওয়া হয়- এটা নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। আসলে উভয় ক্ষেত্রেই নেওয়া হয়। তবে বাস যাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া হয় মূল টিকিটের মাধ্যমে। অর্থাৎ বাস কর্তৃপক্ষ যে টিকিট বিক্রি করে তার সঙ্গে বাসস্ট্যান্ডে প্রবেশ ফি সংযুক্ত থাকে। এটা বাস কর্তৃপক্ষ থেকে পরে বুঝে নেওয়া হয়। কিন্তু লঞ্চ যাত্রীদের ক্ষেত্রে পন্টুনে প্রবেশ ফি আলাদা নেওয়া হয়। এতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। বিষয়টি প্রায়ই ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে। লঞ্চ যাত্রীদের ক্ষেত্রেও ভাড়ার সঙ্গে পন্টুনে প্রবেশ ফি সমন্বয় করার বিষয়টি বিআইডব্লিউটিএ বিবেচনা করতে পারে।
সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মনোয়ার হোসেন: সমকালের জন্য শুভকামনা।