রেলওয়েতে যখনই নিয়োগ, তখনই দুর্নীতি- এ যেন অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। নিয়োগ দুর্নীতিতে জড়িয়ে চাকরি গেছে আলোচিত জিএম ইউসুফ আলী মৃধাসহ তিন শীর্ষ কর্মকর্তার। দুদকের মামলায় কারাভোগও করতে হয়েছে। দুই দুর্নীতি মামলায় জিএম মৃধাসহ তিন শীর্ষ কর্মকর্তা দণ্ডিত হয়ে স্থায়ীভাবে চাকরি খুইয়েছেন। তারপরও এক যুগ ধরে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে নিয়োগ হলেই উঠছে দুর্নীতির অভিযোগ।

জিএম ইউসুফ আলী মৃধার বিরুদ্ধে হয়েছে ১৩টি মামলা। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার পরও নিয়োগে দুর্নীতি থামছে না এবং যোগ্য চাকরিপ্রার্থীরা বঞ্চিত হন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। সর্বশেষ গত ২৮ আগস্ট নিয়োগ দুর্নীতির দায়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) সৈয়দ ফারুক আহমেদ, আরএনবির পূর্বাঞ্চলের চিফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলামসহ পাঁচ শীর্ষ কর্মকর্তাকে আসামি করে মামলা করেছে দুদক।

দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এর উপপরিচালক মো. নাজমুচ্ছাদাত বলেন, রেলে নিয়োগ দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে। সহজে এ দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না। দুদক কঠোর নজরদারি রেখেছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী বলেন, রেলওয়ে এখন চরম ইমেজ সংকটে। সংঘবদ্ধ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা অবৈধ নিয়োগ দিয়ে কোটিপতি হয়ে যাচ্ছেন। অযোগ্য ও অদক্ষ নিয়োগের কারণে দিন দিন রেল ধুঁকে ধুঁকে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে গিয়ে ঠেকেছে।

দুদক পিপি মাহমুদুল হক জানান, রেলওয়ের ১৩টি নিয়োগ দুর্নীতি মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে মামলার রেকর্ড, তথ্য-প্রমাণ দেখে মনে হয়েছে, রেলওয়ের অধিকাংশ কর্মকর্তাই দুর্নীতির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত। রেলের নিয়োগকে টাকা কামানোর মেশিন মনে করেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা। আদালতে মৃধাসহ তিন কর্মকর্তার সাজা হওয়ার পরও শিক্ষা নেননি রেল কর্মকর্তারা।

ফাঁসলেন জিএমসহ পাঁচ কর্তা: রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সিপাহি নিয়োগে মুক্তিযোদ্ধা কোটা, পোষ্য কোটার প্রার্থীদের পাসের কাছাকাছি নম্বর দেওয়া হয়। মৌখিক পরীক্ষায় তাদের দেখানো হয় অনুত্তীর্ণ। যোগ্য প্রার্থীদের বানিয়ে দেওয়া হয় অযোগ্য। পছন্দের অযোগ্যদের বানানো হয় যোগ্য প্রার্থী। কোটায় পছন্দের অযোগ্য প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষায় পাস দেখানো হয়। এ দুটির মতো বিভাগীয় কোটা, জেলা কোটাসহ অন্য কোটা বিধি অনুযায়ী প্রতিপালন না করে অর্থের বিনিময়ে অযোগ্যদের চাকরির সুযোগ করে দেওয়া হয় বলে তদন্তে দুর্নীতির সত্যতা পায় দুদক। ২৮ আগস্ট পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) সৈয়দ ফারুক আহমেদ, বর্তমানে আরএনবির পূর্বাঞ্চলের চিফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলাম, বর্তমানে পশ্চিমাঞ্চলের চিফ কমান্ড্যান্ট মো. আশাবুল ইসলাম, বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব ফুয়াদ হাসান পরাগ ও পূর্বাঞ্চলের সাবেক এসপিও মো. সিরাজ উল্যাহকে আসামি করে দুর্নীতি মামলা করা হয়। ২০১৭ সালে সিপাহি পদে ১৮৫টি পদে নিয়োগের ছাড়পত্র দেওয়া হয়।

খালাসি পদে দুর্নীতি: ২০১৯ সালের ৩১ মার্চ খালাসি পদে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু দুদক তদন্ত করে দেখে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়োগ কমিটির সদস্য এম এ জিন্নাহর মূল্যায়ন নম্বর যোগ না করে, অপর সদস্য খলিলুর রহমানের স্বাক্ষর না নিয়ে সুবিধামতো মার্কশিটে নম্বর বসানো হয়। এক পরিবারের দুই ভাইয়ের বয়সের পার্থক্য ৫ দিন হলেও উভয়ে চাকরি পান এবং ১৯ জনকে জাল সনদে চাকরি দেওয়া হয়। জিএমের চালক হারাধন দত্ত তার আত্মীয়ের বয়স্ক স্ত্রীকে জাল সনদে চাকরি দিয়েছেন। নিয়োগবিধি না মেনে একজনের দুই চাকরি, এক পরিবারের দু'জনের চাকরি, এক স্কুল থেকে একাধিকজনকে চাকরি দেওয়া হয়। ঢাকার শাহজাহানপুর রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক সুরাইয়া সুলতানা জালিয়াতির মাধ্যমে ১২ জনকে অষ্টম শ্রেণির সনদপত্র দেন। রেলওয়ের ঠিকাদার ফাতেমা এন্টারপ্রাইজের মালিক আমিরুজ্জামান চাকরি দেওয়ার কথা বলে এসএ পরিবহনের মাধ্যমে ১৩ জন প্রার্থী থেকে ৫৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। ঢাকার নাখালপাড়ার পারভীন আক্তার ৯ জনকে চাকরি দেওয়ার নাম করে ৩৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা নেন। এভাবে আসামিরা ১ কোটি ২ লাখ ৪৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়। ২০২১ সালের ৩১ মার্চ দায়ের করা এ মামলায় রেলওয়ে জিএম ফারুক আহমেদ, রেল ভবনে কর্মরত মহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প) মিজানুর রহমান, সহকারী মহাব্যবস্থাপক জোবেদা আক্তার, টিএসও রফিকুল ইসলাম, এমএলএমএস হারাধন দত্তসহ চাকরি পাওয়া ১২ জনকে আসামি করা হয়।

আরও ঘটনা: ২০১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর রেলওয়ের ট্রেড অ্যাপ্রেন্টিস পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। এ ঘটনায় বিপাকে পড়ে পরীক্ষা বাতিল করে কর্তৃপক্ষ। এখানেও দুর্নীতির বহু অভিযোগ। পূর্বাঞ্চলের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পরীক্ষার আগের দিন রাতে ফাঁস হলেও সেই প্রশ্নেই পরীক্ষা নেওয়া হয়। ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর সে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৮ সালের ২০ জুলাই রেলওয়ের টিকিট কালেকক্টর গ্রেড-২ পদে অনিয়মের কারণে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এভাবে প্রায় প্রতিটি নিয়োগের বেলায় অনিয়ম-দুর্নীতি ঘটে। ওঠে বিতর্ক।

জিএম মৃধার যত মামলা: বহুল আলোচিত ইউসুফ আলী মৃধা ফুয়েল চেকার, টিকিট চেকার, গুডস সহকারী ও কোর্ট ইন্সপেক্টর, সহকারী কেমিস্টসহ ১৩টি পদে নিয়োগের ঘটনায় ১৩টি দুর্নীতি মামলার আসামি। তার মধ্যে দুটি মামলায় দণ্ডিত হন মৃধা, সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া ও হাফিজুর রহমান। ১১টি মামলা এখনও চট্টগ্রাম আদালতে বিচারাধীন। ৫-৬টি মামলার বিচার শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ২০১২ সালের ৯ এপ্রিল রাতে তৎকালীন রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএসের গাড়িতে ৭০ লাখ টাকা পাওয়ার ঘটনার পর রেলওয়ের জনবল নিয়োগে দুর্নীতির চিত্র প্রথমবার ফাঁস হয়।