বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) একের পর এক শিক্ষার্থী নির্যাতনে আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে ছাত্রলীগ। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ছাত্রলীগের কোনো কমিটি না থাকলেও সংগঠনের দুটি পক্ষ সক্রিয় রয়েছে। তাদের মধ্যেই একটি গ্রুপের হাতে গত মাসে দুই শিক্ষার্থী বেধড়ক মারধরের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া হুমকি-ধমকি ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে অহরহই। এতে ক্যাম্পাস ও হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না তাঁরা।

সবশেষ গত ২৩ আগস্ট রাতে শের-ই বাংলা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আইন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র তারেকুজ্জামানকে তাঁর কক্ষে মারধর করেন ছাত্রলীগের একটি পক্ষের কর্মীরা। এ ঘটনায় ২৮ আগস্ট তিনি হল প্রভোস্টের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এর আগে ১৪ আগস্ট লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী রাব্বি খানকে ক্যাম্পাস থেকে তুলে নিয়ে ২ ঘণ্টা আটকে রেখে মারধর করে সংগঠনের আরেক পক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর খবর পেয়ে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। অথচ ঘটনার আগে কর্তৃপক্ষের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেছিলেন রাব্বি। এ ছাড়া গত ৫ জুলাই মধ্যরাতে শের-ই বাংলা হলে সিট দখল নিয়ে লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মাহামুদুল হাসান দোলনকে ডেকে নিয়ে মারধর করেন ছাত্রলীগ কর্মীরা। দোলনের অভিযোগ, ওই ঘটনায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানান, ছাত্রলীগের দু'পক্ষের মধ্যে একটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন গণিত বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন আহম্মেদ সিফাত। তিনি বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর অনুসারী। অন্যদিকে অমিত হাসান রক্তিমের নেতৃত্বাধীন গ্রুপটি বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি, সদর আসনের এমপি ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের অনুসারী। তবে গত জুলাইয়ে দু'পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের পর থেকে রক্তিমের গ্রুপ ক্যাম্পাসে কোনো তৎপরতায় নেই।
নির্যাতনের শিকার তারেকুজ্জামান অভিযোগ করেন, গত ২৩ আগস্ট রাত ১২টার দিকে হলের সিট দখলকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের কিছু কর্মী তাঁর কক্ষে যান। এক পর্যায়ে তাঁরা তাঁকে মারধর করতে করতে বাইরে নিয়ে যান। এতে অংশ নেন গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী দেলোয়ার হোসেন, মার্কেটিং বিভাগের মো. সোহাগ ও বাংলা বিভাগের রকিবুল হাসান। তাঁরা সিফাতের অনুসারী। সিফাত থাকেন ওই হলের ৪১৮ নম্বর কক্ষে।
হলের প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক আবাসিক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঘটনার দিন রাত ১২টার দিকে দেলোয়ার ও সোহাগ পঞ্চম তলার বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে আসন ফাঁকা আছে কিনা জানতে চায়। এক পর্যায়ে ৫০১২ নম্বর কক্ষ থেকে তারেকুজ্জামানকে মারতে মারতে বের করে।
তাঁরা অভিযোগ করেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য শের-ই বাংলা হল এখন আতঙ্কের নাম। বেশ কিছুদিন ধরে ছাত্রলীগ নামধারী কয়েক শিক্ষার্থী হলের বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে আসন ফাঁকা আছে কিনা তা খোঁজখবর নিচ্ছেন। ফাঁকা সিটে অবৈধভাবে তাঁদের সমর্থক ছাত্রদের তুলে দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভীতির মধ্যে আছেন।
তারেকুজ্জামানকে মারধরে অভিযুক্ত দেলোয়ার ও সোহাগ অবশ্য দাবি করেন, তাঁরা কাউকে মারধর করেননি। তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে। আর ছাত্রলীগের এক পক্ষের নেতা সিফাত বলেন, যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাঁরা তাঁর পরিচিত এবং ছোট ভাই। তবে তাঁরা কাউকে মারধর করেনি। শের-ই বাংলা হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো আতঙ্ক নেই। একটি মহল নানা ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে।
ছাত্রলীগের অপর পক্ষের নেতা অমিত হাসান রক্তিম বলেন, শের-ই বাংলা হলে অবৈধভাবে থাকছেন সিফাত। ওই হলে কোনো সিট খালি থাকলে তাতে জোর করে তাঁর অনুসারীদের তুলে দেওয়া হচ্ছে। এগুলো ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কাজ না।
শের-ই বাংলা হলের প্রভোস্ট আবু জাফর মিয়া বলেন, এক শিক্ষার্থী লিখিতভাবে তাঁকে মারধরের অভিযোগ করেছেন। তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে প্রতিকার হয় না- এমন অভিযোগ সত্য নয়। অন্যায় করে কেউ পার পাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর খোরশেদ আলম বলেন, তিনি মাহামুদুল হাসান দোলনের অভিযোগ পেয়েছেন। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। তবে ২৩ আগস্টের ঘটনার কোনো অভিযোগ পাননি।