রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাকিবুল ইসলাম রানা ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন অমির বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ তদন্ত করতে রাজশাহীতে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের তিন নেতা। তাঁরা ঢাকা থেকে বিমানে এসে বিমানেই ফিরে গেছেন। তবে মাঝখানে তাঁদের একদিনের ঝটিকা সফর ও কর্মকাণ্ড বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ছাত্রলীগের সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। তাঁরা বলছেন, তদন্তের নামে নাটক ও 'ফুর্তি' করেছেন কেন্দ্রীয় নেতারা।

জানা গেছে, তদন্ত কমিটির সদস্যরা মাঝে এক রাত থেকেছেন রাজশাহীর পর্যটন মোটেলের ভিআইপি সুইটে। তিনজনের এক রাত থাকার বিল এসেছে ১৮ হাজার টাকা। খাবার বিল এসেছে ১৬ হাজার ৯৭২ টাকা। তবে এই বিল তাঁরা নিজেরা পরিশোধ করেননি। বকেয়া রেখেই চলে যান বিমানবন্দরে। সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে খোঁজ নেওয়ার পর বিলের টাকা পরিশোধ করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে নভো এয়ারের একটি বিমানে রাজশাহী ত্যাগ করেন তাঁরা।

কমিটি গঠনের সাত মাসের মধ্যেই রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নানা অপকর্ম সামনে আসে। এ নিয়ে সমকালে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ পায়। সম্প্রতি রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি সাকিবুল ইসলাম রানার অডিও ভাইরাল হয়। এতে নিজেকে 'চিটার দলের সর্দার' উল্লেখ করে রানা এক নারী কর্মীকে কুপ্রস্তাব দেন এবং আরেক মেয়েকে পাঠাতে বলেন। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন অমির ফেনসিডিল সেবনের ভিডিও ভাইরাল হয়। গণমাধ্যম ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় ভিডিওটি।

অভিযোগগুলো তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য। তদন্ত কমিটির সদস্য কেন্দ্রীয় কমিটির গণযোগাযোগ ও উন্নয়ন সম্পাদক শেখ শামীম তূর্য, উপ-আইন সম্পাদক আপন দাস এবং সহসম্পাদক তানভীর আব্দুল্লাহ ইউএস বাংলার একটি বিমানে সোমবার সকালে রাজশাহীতে আসেন। এর পর তাঁরা ওঠেন রাজশাহী পর্যটন মোটেলের তিনটি ভিআইপি সুইটে। প্রতিটি রুমের ভাড়া ৬ হাজার টাকা করে ১৮ হাজার টাকা। তাঁদের খাবার বিল আসে ১৬ হাজার ৯৭২ টাকা।
মঙ্গলবার বিকেলে পর্যটন মোটেলে গিয়ে দেখা গেছে, ৪টা ১০ মিনিটে কেন্দ্রীয় নেতারা পর্যটন মোটেল থেকে বেরিয়ে একটি সাদা রঙের প্রাইভেটকারে ওঠেন। কিন্তু তাঁরা মোটেলের বিল পরিশোধ করেননি। কেন্দ্রীয় নেতারা বের হওয়ার সময় জেলা ছাত্রলীগের অভিযুক্ত সভাপতি-সম্পাদকও সঙ্গে ছিলেন। সবাই চলে যাওয়ার পর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের কর্মী মাসুক হেলাল পর্যটন মোটেলের কাউন্টারে গিয়ে কত টাকা বিল তা জেনে নেন।

এ সময় মাসুক হেলাল জানান, জেলা ছাত্রলীগ সম্পাদক জাকির হোসেন অমিও রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ছাত্র। তিনিও পড়েন এই মেডিকেল কলেজে। তিনি বিল জেনে গেছেন- বিল পরিশোধ করবেন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। সোমবার কেন্দ্রীয় নেতারা আসার আগে মাসুক হেলালই রুম বুকিং করেছিলেন বলে জানালেন।

এ সময় পর্যটন মোটেলের রিসিপশনিস্ট আব্দুল জলিল বলেন, 'উনারা পর্যটন মোটেলের ভিআইপি সুইটে থেকেছেন। ১৮ হাজার টাকা বিল এসেছে। এর মধ্যে ২০ শতাংশ ছাড় পাবেন। খেয়েছেন ১৬ হাজার ৯৭২ টাকা। উনারা বিল না দিয়েই চলে গেছেন। তাঁদের রুম বুক করেছিলেন রাজশাহী মেডিকেলের ছাত্র মাসুক হেলাল নামের একজন। তিনি বলেছেন, বিমানবন্দরে তাঁদের তুলে দিয়ে এসে বিল দেবেন।'

বিমানে ওঠার আগেই তানভীর আব্দুল্লাহর কাছে জানতে চাওয়া হলে অবাক হয়ে তিনি বলেন, 'বিল দেয় নাই? এগুলো তো জানি না। আমাদের লোকাল প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারি বলেছিল যে, বিল আমরা দিচ্ছি। বিল আসছে কত?' বিলটা অভিযুক্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কেন দেবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আপনারা হয়তো জানেন না, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ যেখানে যায়, সেখানকার লোকাল যারা আছে, তারাই খরচ করে। সব জায়গাতেই তারা করে। তারা যদি না করে তবে আমরা করব। এখন জানলাম, এটা আমরা পকেট থেকে দেব। কোনো ব্যাপার না।'

কোন বিমানে ঢাকা যাচ্ছেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'কোন বিমানে যাচ্ছি সেটা এখনও দেখি নাই। তারা টিকিট কাটছে তো।' কারা টিকিট কাটছে- জানতে চাইলে এবার তিনি বলেন, 'আমরাই কাটছি।' রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগ বিমানের টিকিট করেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আমাদের বাপ-চাচার কিংবা ফ্যামিলির কোনো ঐতিহ্য নাই? তিন-চার হাজার টাকার বিমানের টিকিট আমরা করতে পারি না। ওরা কেন দেবে?' পরে সন্ধ্যা ৬টায় তানভীর আব্দুল্লাহ বলেন, 'আমরাই বিল পরিশোধ করেছি।' এ সময় হোয়াটস অ্যাপে তিনি বিল পরিশোধের ভাউচারও পাঠান।
এর পর পর্যটন মোটেলের অভ্যর্থনাকারী আব্দুল জলিল টেলিফোনে জানান, তিনটি রুম ভাড়া ২০ শতাংশ ছাড় দিয়ে ১৪ হাজার ৪০০ টাকা এবং খাবার ১৬ হাজার ৯৭২ টাকা একজন লোক এসে পরিশোধ করে গেছেন। তবে তাঁর পরিচয় জানাতে পারেননি তিনি।

জানতে চাইলে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন অমি বলেন, 'উনারা আমাদের অতিথি। আমরা এখনও ছাত্রলীগের কমিটিতে আছি। আমরা দোষী হিসেবে চিহ্নিত হইনি। আমাদের কমিটির কার্যক্রম স্থগিত নেই। কেন্দ্রের নেতারা এলে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আমরাই করে থাকি। তাই আমরা বিল দিতে চেয়েছিলাম। পরে উনারা বললেন, আমরা বিল দিলে কথা উঠবে। তাই আমাদের বিল দিতে হয়নি।'

তিনি আরও জানান, আমাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তার লিখিত জবাব দিয়েছি। তারা অনেকের কাছ থেকেই কথা শুনেছেন। এ বিষয়ে ছাত্রলীগ সভাপতি সাকিবুল ইসলাম রানাকে ফোন দিলে তিনি বলেন, 'বিল মনে হয় উনারাই শোধ করেছেন। আমরা জানি না কে দিছে। আমরা উনাদের সঙ্গে শুধু প্রটোকল মেনটেইন করেছি। আসার সময় সালাম, যাওয়ার সময় সালাম দিয়েছি।'

ছাত্রলীগের একাধিক নেতা জানান, তদন্ত কমিটির তিন সদস্যের সঙ্গে সার্বক্ষণিক ছিলেন অভিযুক্ত সাকিবুল ইসলাম রানা ও জাকির হোসেন অমি। তাঁদের সামনেই ছাত্রলীগের অন্য নেতাদের কাছ থেকে তাঁদের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। তাই অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পাননি। তদন্ত কমিটির সদস্যরা দেখা করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন এবং জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অনিল কুমার সরকারের সঙ্গে। ঘুরে আসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকেও। পরে রাতে পর্যটন মোটেলে বসেই তদন্ত করেন।

ছাত্রলীগের একাধিক নেতা বলেছেন, 'এসব তদন্ত শুধুই নাটক। লোক দেখানো।' যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁদের টাকায় থেকে-খেয়ে কী তদন্ত হবে?'

তদন্তে কী পাওয়া গেছে- তা জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির সদস্য ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-আইন সম্পাদক আপন দাস বলেন, 'আমরা যা পেয়েছি তা কাউকে বলার সুযোগ নেই। তদন্ত রিপোর্ট দপ্তর সেলে জমা দেব। তারপর সভাপতি-সম্পাদক তা প্রকাশ করবেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে। আমরা তদন্ত করেছি। অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। তদন্তে যা পাওয়া গেছে, তা পরে জানানো হবে।'

গত ১৫ সেপ্টেম্বর এই তদন্ত কমিটি করে দেওয়া হয়। সাত কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।


বিষয় : রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে তদন্ত

মন্তব্য করুন