সড়কে আবারও পার্কিং ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। এর আগে নগর পরিকল্পনাবিদ ও ট্রাফিক পুলিশের আপত্তির মুখে দুই দফা পিছিয়ে এসেছিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও সিটি করপোরেশন। ঘুরেফিরে আবারও একই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগর পরিকল্পবিদরা। তাঁরা বলছেন, সড়কে টাকার বিনিময়ে পার্কিং (পে-পার্কিং) করা হলে যানজট বাড়বে। কমবে গাড়ির গতি। ট্রাফিক পুলিশ বলছে, এমনিতেই যানবাহন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা। সড়কে পার্কিং করা হলে এটি নতুন সমস্যা তৈরি করবে।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ বড়ূয়া সমকালকে বলেন, সড়কে পে-পার্কিং করতে হলে আগে পরিকল্পনা করতে হবে। এরপর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা করতে হবে। দেখতে হবে সড়কের প্রশস্ততা ঠিক রেখে পার্কিং স্থান নির্ধারণের জন্য সড়কে পর্যাপ্ত জায়গা আছে কিনা। যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক গাড়ির জন্য আলাদা লেন করতে হবে। যত্রতত্র পার্কিং বন্ধ করতে হবে। এসব না করে হুট করে সড়কে পে-পার্কিং করলে ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর চসিকের সাধারণ সভায় আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের নিচে জিইসি মোড়, পিসি রোড ও নগরের উপযুক্ত সড়কে পে-পার্কিং ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের জন্য সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এ প্রসঙ্গে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, কোন কোন সড়কে পার্কিং করা হবে তা চিহ্নিত করতে নগর পরিকল্পনা বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের কাছ থেকে তালিকা পেলে সিএমপির সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পে-পার্কিং কীভাবে পরিচালনা করা হবে তারও একটি গাইডলাইন তৈরি করা হবে।

চসিক সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে নগরের লালখানবাজার থেকে মুরাদপুর পর্যন্ত আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভার নির্মাণের পর এর নিচে সড়কে পার্কিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সিডিএ। তখন সিটি করপোরেশন, নগর পরিকল্পনাবিদ ও ট্রাফিক পুলিশের আপত্তির মুখে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছিল প্রতিষ্ঠানটি। ফ্লাইওভারটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য হস্তান্তরের পর টাকার বিনিময়ে সড়কের মাঝখানে পার্কিং স্থান নির্ধারণ করে চসিক। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রমের উদ্বোধনও করেন তৎকালীন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। সড়কে পার্কিং করা হলে যানজট ও জনদুর্ভোগ বাড়বে উল্লেখ করে পরদিনই আপত্তি জানায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। নগর পরিকল্পনাবিদরাও তাঁদের আপত্তির কথা জানান। তাঁদের আপত্তির মুখে পার্কিং বন্ধ করা হয়।

নতুন সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সিএমপি কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় সমকালকে বলেন, সড়কে পার্কিং করার বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের জানানো হয়নি। তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করা হলে যাচাই-বাছাই করে মতামত জানাবেন। সড়কে পার্কিং করার মতো পরিস্থিতি আছে কিনা তাও ভেবে দেখতে হবে।

ট্রাফিক বিভাগ সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম নগরে বর্তমানে ৩ লাখ যানবাহন চলাচল করছে। কিন্তু সে অনুযায়ী নগরে পর্যাপ্ত সড়ক নেই। এ কারণে নগরের মূল সড়ক, বাণিজ্যিক, আবাসিক ও বন্দর এলাকায় প্রায়ই অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ থাকে। যানজট নিরসনে প্রচণ্ড বেগ পেতে হয় ট্রাফিক পুলিশকে। পাশাপাশি সিডিএ, সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের জন্য সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছে। এতে সড়কগুলো সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় পে-পার্কিং করা হলে কিছু প্রতিষ্ঠান সবসময় তাদের জন্য বরাদ্দ স্থানে গাড়ি রেখে স্থায়ীভাবে রাস্তা ব্যবহারের সুযোগ নেবে। পাশাপাশি কিছু কিছু রাস্তা সরু হওয়ায় সেখানে পে-পার্কিং করা হলে গাড়ি চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া যাবে না।

গতকাল সড়কে যানবাহন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় সমকালের। তাঁরা বলছেন, চট্টগ্রাম নগরের উল্লেখযোগ্য অংশ অল্পবৃষ্টিতে ডুবে যায় এবং গাড়ি চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না। পে-পার্কিং করা হলে বর্ষাকালে চরম যানজটের সৃষ্টি হবে যা নিরসন করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ফুটপাতগুলো বেদখল। নগরজুড়ে মানুষের হাঁটার ব্যবস্থা নেই। সড়কে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে হাঁটতে হয়। চার লেনের সড়কে দুই লেনই দখল হয়ে থাকে। এ অবস্থায় সড়কে পে-পার্কিং করলে তা হবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

নগর পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) জয়নুল আবেদীন সমকালকে বলেন, সড়কে পার্কিং করা হলে এটি ব্যবস্থাপনা কে করবে? ট্রাফিক পুলিশ তো নিয়মিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণেই হিমশিম খাচ্ছে। ফ্লাইওভারের নিচে সড়কের মাঝখানে পার্কিং করা হলে সেখানে গাড়ি ঢুকবে, বের হবে। তাও সড়কের যান চলাচলের ওপর প্রভাব ফেলবে। এতে গাড়ির গতি শ্নথ হবে।